বাংলা থিয়েটারের ট্রাজিক বিদ্রোহী নায়ক: শিশির কুমার ভাদুড়ী

শেয়ার করুন

বাঙালী মধ্যবিত্তের থিয়েটারের আদি লগ্নের রূপকার যদি হন গিরিশচন্দ্র ঘোষ, তবে মানতেই হয় বিংশ শতাব্দীর (দ্বিতীয় চতুর্থ দশক জুড়ে) এসে সেই থিয়েটার পূর্ণতা পায় শিশির কুমার ভাদুড়ীর (১৮৮৯-১৯৫৯) হাতে। পাশ্চাত্য দেশের জার্মানীতে ডিউক অফ হানঙ্গেন এর মতন বাংলা থিয়েটারে পরিচালকের স্বত্ত্বা আবিষ্কার করেন শিশির কুমার ভাদুড়ী। বাংলা থিয়েটারে বাস্তববাদ, প্রকৃতিবাদ এই উভয়েরই স্রষ্টা তিনি। শিশির কুমারের হাত ধরেই বাংলা থিয়েটার আধুনিকতার পথে এগিয়েছে। প্রাক্ শিশির পর্বে বাংলা নাট্য প্রযোজনায় (গিরিশচন্দ্রের অবিস্মরণীয় অভিনয়ের কথা মনে রেখেও বলা যায়) অভিনয় বলতে বোঝায়– ‘এগিয়ে গিয়ে চেঁচিয়ে বল’। শিশির কুমারই সেখানে অভিনয় রীতিতে এক বিরাট পরিবর্তন এনেছিলেন, নাট্য প্রযোজনায় নতুনত্ব যোগ করেছিলেন। মঞ্চসজ্জা, পোশাক, আধুনিক বৈদ্যুতিক আলোর ব্যবহারে সুসমঞ্জস্য সমন্বয় ঘটিয়ে নাট্য প্রযোজনাকে গতিশীল ও আধুনিক করা যায়, তা ‘সীতা, ‘দিগ্বিজয়ী’ প্রভৃতি নাটকে তিনি মূর্ত করে তুলেছিলেন। শিশির কুমার আধুনিক নাট্যরীতির স্পেস বা পরিসরকে উপযুক্ত ভাবে ব্যবহার করেছিলেন। নাট্য শিল্পে ইম্প্রেশনিজম – এর যে ছোঁয়া ইউরোপীয় নাট্যধারায় দেখা যেত, তার যথার্থ প্রতিফলন ঘটেছিল শিশির কুমারের নাট্যপ্রয়োগ ভাবনায়। একথা আজ স্পষ্ট যে পেশাদারী রঙ্গমঞ্চের (১৯২১-১৯৪৪) শিশির কুমারই সেই একমাত্র ব্যক্তি যিনি সত্যিকারের নাট্য প্রযোজক বলে নিজেকে দাবি করতে পারেন। নাট্যাচার্য ভরত এর কথা মত, নাট্য প্রযোজনাকে শাস্ত্র জ্ঞানের সঙ্গে কলাজ্ঞানেও পারদর্শী হতে হবে। ইংরাজি সাহিত্যের অধ্যাপনা, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, দ্বিজেন্দ্রলাল, অবনীন্দ্রনাথ, ক্ষীরোদপ্রসাদ, অমৃতলাল, পরেশ চন্দ্র প্রভৃতির সঙ্গে সান্নিধ্যে শিশির কুমার নিজের নাট্যচলনে ও চর্চায় সেই প্রজ্ঞা অর্জন করেছিলেন, যা তাকে আচার্য ভরত বর্ণিত প্রকৃত নাট্য প্রয়োগ কর্তার পরিণত করেছিল। একথা ঠিক শিশির কুমার কোনো নাটক তার বন্দিত মননশীল অভিনয়ের রীতিধারাতার তাৎপর্যমণ্ডিত বোধনুসারী ঘরানা (সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় ব্যতিক্রম) নেই, তথাপি স্বীকার করতেই হবে, তার মত বিদগ্ধ ব্যক্তিত্ব, নাট্যবোধ ও দুর্জয় সাহস সেকালে কারোরই ছিল না।

শরৎচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথ তাঁদের গল্প-উপন্যাসের নাট্যরূপ ও নাটক শিশির ভাদুড়ীর অভিনয়ের জন্য নির্দিষ্ট করতেন

তার অভিনয়ে, “শব্দ-অর্থ প্রাণ পায় মূর্তর-রাগে”। রসনার মত তার প্রত্যেকটি অঙ্গ কথা বলতো। তাঁর অভিনয় মাধুর্য্যে, কণ্ঠস্বরে, অঙ্গ সঞ্চালনে কান এবং চোখ উভয়েরই তৃপ্তি হতো। মোহিত লাল মজুমদার, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র সকলেই মুক্ত কণ্ঠে শিশির কুমারের অভিনয়ের প্রশংসা করেছেন। রঘুবীর, সীতা, দিগ্বিজয়ী, জনা, প্রফুল্ল, পান্ডবের অজ্ঞাতবাস, বিজয়া প্রভৃতি নাটকের অভিনয় বিদ্বজন ও সাধারণ দর্শক উভয় শ্রেণির দর্শককেই মুগ্ধ-তৃপ্ত করেছিল। ১৯২৪ সালের আগস্ট মাসের ছয় তারিখে মনমোহন নাট্য মন্দির প্রতিষ্ঠা করে, প্রদর্শন কক্ষের দ্বারে দ্বারে মঙ্গলঘট, আম্রপল্লব, আর কদলীবৃক্ষের মাঙ্গলিক চিহ্ন স্থাপন করে, দর্শনীয় বিনিময়ে প্রবেশপত্র দিয়ে ইংরেজি বায়নার প্রয়োগ ত্যাগ করে তার বদলে ক, খ, গ, ইত্যাদি এবং আসন সংখ্যা ১, ২, ৩ ক্রমিক ভাবে সাজিয়ে, যোগেশ চৌধুরীর “সীতা” নাটকের অভিনয়ের মাধ্যমে শিশির কুমার বাংলা থিয়েটারের প্রযোজনার দেশীয় সংস্কৃতির উপস্থাপনা ঘটিয়েছিলেন। সেইসময়ের দুই সাহিত্যিক বন্ধু, হেমেন্দ্র কুমার রায় ও প্রেমাংকুর আতর্থীর প্রতিষ্ঠিত ‘নাচঘর’ পত্রিকার সঙ্গেও তার ঘনিষ্ট সম্পর্ক ছিল। এই পত্রিকায় তার অভিনয়ের প্রশংসা করে লেখা হয়, “সংলাপে শব্দের অর্থ বুঝে উচ্চারণও কণ্ঠস্বরের পরিবর্তন এবং মঞ্চের উপরে অবস্থান কালে সংলাপনা থাকলেও, অভিনেতা হিসাবে স্থির বা আড়ষ্ট না থাকার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে, তিনিই বাংলা নাট্যভিনয়কে আধুনিক করে তুলেছিলেন”। শরৎচন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথ তাঁদের গল্প-উপন্যাসের নাট্যরূপ ও নাটক শিশির ভাদুড়ীর অভিনয়ের জন্য নির্দিষ্ট করতেন, শরৎচন্দ্র রাধারানী দেবীকে লিখেছিলেন, “কি চমৎকার অভিনয় করে শিশির। আরও চমৎকার তার শেখানোর পদ্ধতি”। রবীন্দ্রনাথও তাঁর অভিনয়ের প্রশংসা করেছেন, “সীতা’ নাটকের নভিনয় দেখে শিশির কুমারের বাচনভঙ্গীর অকুণ্ঠ প্রশংসা করে তাকে “মৌলিক” আখ্যা দিয়েছিলেন। শিশির কুমারের উত্তরসূরী শম্ভু মিত্র-উৎপল দত্ত উভয়েই তাঁর শেষ বয়সের অভিনয় দেখে সমুগ্ধ প্রশংসা করেছেন। আমেরিকায় গিয়ে অভিনয়, সতু সেনের মত নেপথ্য মঞ্চ কর্মীকে আবিষ্কার, বাংলায় প্রথম ব্রেখট এর নাট্যভাষার পাঠ-অনুশীলন শিশির কমারের অনন্য ব্যক্তিত্বের কতিপয় নমুনা মাত্র। চিন্তায় তিনি ছিলেন প্রতিজ্ঞানিষ্ঠ। রবীন্দ্রনাথকে শ্রদ্ধা জানিয়েই তিনি ‘রক্তকরবী’র অভিনয়ে রাজী হননি। আপন নাট্যশালা প্রতিষ্ঠা করতে না পারার অতৃপ্তি থেকেই তিনি শেষ জীবনে অভিনয় থেকে দূরে সরে ছিলেন। আত্মমর্যাদা বোধ ছিল তার সহজাত। তাই ব্যক্তিগত বা সরকারী বদান্যতাকে তিনি প্রশ্রয় দেননি। এমনকী ভারত সরকার প্রদত্ত ‘পদ্মশ্রী’ খেতাব নিতেও অস্বীকৃতি জানান। জাতির জনক মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর সঙ্গে ২রা অক্টোবর দিনটি বাংলা আধুনিক নাট্য প্রয়োগরীতির জনক শিশির কুমার ভাদুড়ীকে সম্মান জানানোর প্রত্যাশায় বাংলা নাটকের অযুতকর্মী, তিনিই প্রথম শিখিয়েছেন, চরিত্রের ধারণাকে কি করে বাস্তবোচিত করে তোলা যায়।

শেয়ার করুন