কলকাতার সাহেব-মেমদের থিয়েটার

শেয়ার করুন

আমাদের এই কলকাতার প্রথম থিয়েটার কোথায় ছিল জানেন? ডোমতলা? মানে আজকের এজরা স্ট্রিট? যেখানে ঝাড়লণ্ঠন পাওয়া যায়? আরে ধুর! সে তো বাংলা থিয়েটার, এক রাশিয়ানের গলগ্রহ। ইতিহাস সাক্ষী, গেরাসিম লেবেদেফের কলকাতায় পাড়ি জমানোর আগে ঢের আগে, এমনকী আলিবর্দির নাতি সিরাজ-উদ-দৌলা এ সুবে বাংলার নবাব হবার ক’বছর আগে থেকেই কলকাতায় একটা থিয়েটার ছিল। আরে বাবা, সেই মুর্শিদকুলি খানের জমানা থেকে সাহেবরা কলকাতায় এসে মশার কামড় সয়ে করে খাচ্ছে, কোর্ট-কাছারি খুলছে, গির্জা গড়ছে, কেল্লা বানানোর তাল করছে, নিছক আমোদআহ্লাদের জন্য তারা একটা থিয়েটার করবে না তাও কি হয়?

তাই থিয়েটার একটা হয়েছিল। যেভাবে বানিয়াগিরি করে বরাত ফেরাতে শয়ে শয়ে সাহেব ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঝাণ্ডা উঁচিয়ে আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে বঙ্গোপসাগরে জাহাজ ভিড়িয়েছিলেন, কতক সেভাবেই থিয়েটার করে দেশোয়ালি ভাইদের সান্ধ্য মনোরঞ্জন বিলোবার ঠিকে নিয়েছিলেন এক সাহেব। তার নাম ইতিহাস লিখে রাখেনি। তবে তার প্লেহাউসে কোম্পানির কর্মচারীরা থেকে থেকে ভিড় জমাত। আজকের বি-বা-দী বাগের ভরকেন্দ্র সেন্ট অ্যান্ড্রুজ চার্চ। তার উত্তর-পূর্ব দিকে ছিল এই নাট্যশালা। স্বদেশে যে সব নাটক চলে সেগুলোই ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে চালানো হত। মাঝেসাঝে নাচগান হত। নিছক মন ভজাবার রং জমাবার বিনোদন। ১৭৫৬ সালে সিরাজ যেবার কলকাতা অবরোধ করলেন সেবার কামানের গোলায় ধসে গেল প্লেহাউস। সাক্ষী রইল পুরোনো ফোর্ট উইলিয়াম আর লালদিঘির জল।

বিশ শতকের শেষাশেষি শেকসপিয়ারের গ্লোব থিয়েটার আবার মাথা তুলেছে লন্ডনের বুকে। আমাদের কলকাতায় সবচেয়ে পুরোনো ইঁটের পাকা বাড়ি বলতে জোব চার্নকের সমাধিসৌধ। তবে হ্যাঁ, আমরা অনেক খুঁজে পেতে নাট্যপথের দিশারি সেই প্লেহাউসের আদত জায়গাটা বার করেছি। কলকাতা পুলিশের সদর দফতর লালবাজার থেকে রাইটার্স বিল্ডিং আসার পথে বাঁ দিকে একটা রাস্তা চলে গেছে ম্যাঙ্গো লেনের দিকে। সেই রাস্তায় একটু গেলেই বাঁ হাতে মার্টিন বার্ন কোম্পানির উঁচু ইমারত। সেখানেই ছিল প্লেহাউস। কলকাতা কবে লন্ডন হবে জানি না, তবে এই বাড়িটার সামনে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে একটা প্লাক বা পাথর বসানো হলে আমাদের নাট্যসংস্কৃতির ভিত একটু পোক্ত হবে। সেই শুরু। সেদিন থেকে মোটামুটি ১৮৫০-এর দশক  অবধি অর্থাৎ সর্বসাকুল্যে একশো বছর ধরে কলকাতায় ইংরেজদের থিয়েটারের  রমরমা ছিল। আমরা আজকাল মিনার্ভা-স্টার-রবীন্দ্র সদন-অ্যাকাডেমি  অফ  ফাইন আর্টস-গিরিশ মঞ্চ-মধুসূদন মঞ্চে যে থিয়াটারের চর্চা করি তার খোলস তো বটেই, কাঠামোটাও ওই ইংরেজদের দয়ায় পাওয়া।

বলাই বাহুল্য, ইংরেজদের থিয়েটার মোটের ওপর সাহেব-মেমদের মন পেতে চেয়েছে। ব্রিটিশ উপনিবেশ যত জাঁকিয়ে বসেছে তত জমক দেখেছে ঔপনিবেশিক নাটমঞ্চ। তাদের দেখাদেখি কলকাতায় জাঁকিয়ে বসা বাবুরা এই থিয়েটারে আনাগোনা করেছেন, কয়েকজন ভাগ্যবান সেখানে অভিনয় করেছেন, একজন মালিকানাও সামলেছেন। কলকাতার দেখাদেখি বোম্বাই, মাদ্রাজ, এলাহাবাদ, সিমলা, নৈনিতাল তো বটেই; দমদম, ব্যারাকপুর, বহরমপুর, কানপুর, আগ্রা, মিরাটের মতো ক্যান্টনমেন্ট টাউনেও সাহেবদের থিয়েটারের পাট বসেছে। একে কেউ কেউ ‘অ্যামেচার থিয়্যাটিক্যালস’ বলে চেনেন। আমরা এই ইতিহাস জানি না বললেই চলে। আপাতত এর কলকাতা পর্বটাকে ছোটো করে দেখে নেব। চুম্বকে ধরার চেষ্টা করব সেই বর্ণাঢ্য অতীতকে।

১৭৫৭-এর ২৩ জুন থেকে কলকাতার বুকে ইংরেজ কোম্পানির মৌরুশি পাট্টা কায়েম হয়। সাহেব পাড়া আর নেটিভ পাড়া গজিয়ে ওঠে। গভর্নর্স হাউস তখন মাথা তোলেনি। ওয়ারেন হেস্টিংস পাড়ি জমান খানিক দক্ষিণে, আজকের আলিপুরে। বেলভেডেয়ারের প্রাসাদে কোম্পানির উঁচু দরের কর্মীরা বাসা পাতেন। চৌরঙ্গির কাছে জজসাহেব ইলাইজা ইম্পের বাসার লাগোয়া ডিয়ার পার্কের আশেপাশে পটাপট বাড়ি উঠতে থাকে। রাইটার্স বিল্ডিং-এর আদি বাড়ির পত্তন হয়। কাউন্সিল হাউস স্ট্রিট দিয়ে হাতি-ঘোড়া চলতে শুরু করে। আর এই সময় এক নিলামওয়ালার হাত ধরে ১৭৭৫ সালে সাবেক কলকাতার দ্বিতীয় থিয়েটার গড়ে ওঠে।

নিলামওয়ালার নাম জর্জ উইলিয়ামসন। পুঁজিপাটা বিশেষ নেই, সাধ আছে আকাশছোঁয়া। বড় সাহেবদের কাছে হাজার টাকার একেকটা শেয়ার বেচে লাখ খানেক টাকা তুলে ফেললেন মানুষটা। আত্মপ্রকাশ করল নয়া থিয়েটার। লোকমুখে নাম ছড়াল নিউ প্লেহাউস। পোষাকি নাম হল ক্যালকাটা থিয়েটার।

আবির্ভাবেই সাড়া ফেলে ছিল ক্যালকাটা থিয়েটার। রাতারাতি শেয়ার বাজারের লাগোয়া রাস্তার নাম হয়ে গেছিল থিয়েটার স্ট্রিট। লাগাতার ৩৩ বছর ধরে রইস কোম্পানির বাবুদের সেবা করার পর ১৮০৮ সালে যখন ঝাঁপ ফেলল ততদিনে শেকসপিয়ার থেকে শেরিডান সবার নাটকদেখে ফেলেছে এই নাটমঞ্চ। কোম্পানির ডিরেক্টরদের মুখের ওপর তুড়ি মেরে মহিলা চরিত্রে অভিনেত্রীদের কাস্টিং করেছে। অ্যামেচার থকে প্রফেশনাল থিয়েটারের রাস্তায় অনেকটা এগিয়ে দিয়েছে কলকাতাকে। খবরে প্রকাশ, সেকালের সেরা ইংরেজ নট ডেভিড গ্যারিক(যাঁর গরিমা একদিন আমাদের গিরিশচন্দ্র ঘোষকেও পরিতোষ দিয়েছে) এই ক্যালকাটা থিয়েটারের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। কোন নাটকে কীরকম সিন-টিন টাঙানো হবে লন্ডনে বসে নিজের হাতে তার তদারক করেছেন গ্যারিক। লোকজন পাঠিয়ে অঙ্গসজ্জায় সহায়তা করেছেন। সেকেন্ড লন্ডন হবার সম্ভাবনা খুলছে যেখানে, সেখানে একটা পদের থিয়েটার হবে না? খালি গ্যারিক নয়, লন্ডনের আরও খানদানি থিয়েটারওয়ালারও নেকনজরে ছিল এইসব নাট্য উদ্যোগ। ক্যালকাটা থিয়েটারের দেখাদেখি ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে দরজা খুলেছিল হোয়েলার প্লেস থিয়েটার। সিজন টিকিট, বেনিফিট নাইটের মতো কলকবজা করেও বছর দুয়েকের বেশি টানতে পারেনি। মোদ্দা কথা, থিয়েটারও যে একটা প্রাইভেট এন্টারপ্রাইজ হতে পারে তার বোধবুদ্ধির পরিচয় সেই সময়ের সাহেবরা বারংবার দিয়েছেন। নইলে কতজন সাহেব থাকত সেকালের কলকাতায়? হাজার দশেকও নয়। তাদের অডিটোরিয়ামে টানার জন্য নিত্য নতুন নাটক নামানোর হাঙ্গামা কিছু কম ছিল না। টিকিটের দাম এক মোহর হলেও লাভের গুড় খেয়ে যাবার মতো পিঁপড়ে কম ছিল না। তবু ‘হাল ছেড়ো না বন্ধু’ হেঁকে এলাহি বন্দোবস্ত করতেন থিয়েটার ম্যানেজারের দল। সাহেব-মেমদের মধ্যেও তো শ্রেণিবৈষম্য ছিল। সেদিকেও নজর থাকত তাদের।

অবিশ্যি সব উদ্যোগ জনগণেশের জন্য ছিল না। নতুন করে গড়ে তোলা ফোর্ট উইলিয়ামে ১৭৮৯ সালের পয়লা মে চালু হয়েছিল মিসেস ব্রিস্টো নামে এক কোম্পানি অফিসারের ঘরনির গড়ে তোলা প্রাইভেট থিয়েটার। তুমুল হর্ষোল্লাস পেয়েছিল। উল্লাস দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। বছর ঘুরতে না ঘুরতে কত্তার ট্রান্সফার অর্ডার এল। জাহাজঘাটা থেকে ভোঁ দিয়ে রওনা দিল মিসেস ব্রিস্টোর জাহাজ। গঙ্গাবক্ষে মিলিয়ে গেল শতেক দীর্ঘশ্বাস। বস্তুত কলকাতার বুকে পাথুরিয়াঘাটা, পাইকপাড়া, বেলগাছিয়া ইত্যাদি রাজবাড়িতে প্রাইভেট থিয়েটারের যে জোয়ার এসেছিল উনিশ শতকের মাঝামাঝি, তার অনুপ্রেরণা ছিল মিসেস ব্রিস্টোর উজ্জ্বল উদাহরণ।

উনিশ শতকে যখন এসেই পড়েছি তখন এথেনিয়াম থিয়েটারের নামটা ভুলি কী করে? ক্যালকাটা থিয়েটারের এন্তেকালের চার বছরও কাটল না, আবার নতুন থিয়েটার খোলার ইনসারশন বেরল ক্যালকাটা গেজেটের পাতায়। ১৮১২ সালের ১৯ মার্চ তারিখে। ১৮ নম্বর লোয়ার সার্কুলার রোডে নতুন থিয়েটার খুলছে। এখন যেখানে ‘এই সময়’ খবরের কাগজের অফিস, তখন সেখানে জনমনিষ্যির বাস কম। সাহেবপাড়া থেকে যাওয়া-আসার অসুবিধা অনেক। তবু মরিস বলে এক সাহেব চেষ্টাচরিত্তির করেছিলেন সেখানে লোক টানতে। বুক ঠুকে ‘হ্যামলেট’ পর্যন্ত নামিয়েছিলেন। হালে পানি না পেয়ে শেষটায় দমে যান। কলকাতার বুকে এমন থিয়েটার গড়ার নেশায় মাতাল হয়েছেন আরও অনেক সাহেব। আমরা আত্মবিস্মৃত বাঙালি খালি ১৭৯৫ সাল তাক করে বসে থেকেছি, আমাদের থিয়েটারের সম্পূর্ণ পরম্পরাকে বেমালুম ভুলে গেছি। টাউন হল সারিয়ে তুলে আমরা স্বদেশী আন্দোলনের গুণগান করছি, কখনও বলছি না যে সেখানেও হইহই করে থিয়েটার হয়েছে এককালে। সাহেবদের জল-অচল করে রাখলে তো টাউন হলটাকেই অপ্রাসঙ্গিক করে ফেলা হয়।

তবে টাউন হল নয়, উনিশ শতকের সাহেবি থিয়েটারের হদ্দমুদ্দ হল চৌরঙ্গি থিয়েটার। আজ থেকে ঠিক দুশো বছর আগে ১৮১৩ সালের ২৭ নভেম্বর বড়লাট লর্ড ময়রা আর লেডি ময়রা (যাদের নামে ময়রা স্ট্রিট) এসেছিলেন চৌরঙ্গি থিয়েটারের উদ্বোধনে। না এসে পারেন, কলকাতার ডাকসাইটে লোকজনের বারো আনাই যে এই থিয়েটারের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে। হিন্দু কলেজ তখনও গড়ে ওঠেনি। কিন্তু শেকসপিয়ার শিক্ষক হিসেবে নামডাক ছড়িয়েছে ডি এল রিচার্ডসনের। তিনি এই উদ্যোগের হোতা। পাশে আছেন কোম্পানির মাথারা। এবং আছেন প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর। সবাই মিলে বানিয়েছেন অ্যামেচার ড্রামাটিক সোসাইটি। টাকা ঢেলে শেয়ার কিনেছেন। এই সোসাইটির হাতেই আছে চৌরঙ্গি থিয়েটারের লাগাম। ছুটল ঘোড়া বিরজিতালাও তাক করে। দমদম, বৈঠকখানা যেখানে যত ছোটোখাটো থিয়েটার ছিল সব জায়গায় সেরা অভিনয় প্রতিভার সম্মেলন ঘটল এই মঞ্চে।

কোথায় ছিল এই মঞ্চ? ৩৩ চৌরঙ্গি রোডে, অর্থাৎ বিড়লা প্ল্যানেটরিয়ামের ঠিক পুব দিকে সাহারা ইন্ডিয়া ভবন দাঁড়িয়ে যে জমির ওপর, সেখানে। ১৮৩৯ সালে এক বিধ্বংসী অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে চৌরঙ্গি থিয়েটার, কিন্তু তার পাশ দিয়ে একেবারে পার্ক সার্কাস সাত মাথার মোড় অবধি যে রাস্তা তার পুরোনো নাম থিয়েটার রোডে র‍য়ে গেছে তার অনুরণন। ১৯৬৪ সালে উইলিয়াম শেকসপিয়ারের জন্মের ৪০০ বছরে থিয়েটার রোডের নাম বদলে শেকসপিয়ার সরণি করা হয়েছিল। সাইনবোর্ডে, লেটরহেডে নতুন নাম চালু হয়ে গেছে কবে! কিন্তু ট্যাক্সি-ওয়ালা থেকে মিনিবাসের হেল্পার – সবাই এখনও আগের থিয়েটার রোড নামটাই বলেন। ভালোই করেন। যেনতেনপ্রকারেণ ঔপনিবেশিক প্রভুদের ওপর শোধ তুলতে গিয়ে ঔপনিবেশিক ইতিহাসটাকেই ভুলতে বসেছে কলকাতা। ধুয়েপুঁছে সাফ করেছে নিজের বাপখুড়োর বংশলতিকা। থিয়েটার রোড, পার্ক স্ট্রিট, চৌরঙ্গি, ডালহাউসি, টেরিটি বাজার এইসব নামগুলো উচ্চারণ করলে জেনে হোক, না-জানে হোক একটু ইতিহাসসংলগ্ন তো হওয়া যায়।

থাক সে কথা।

চৌরঙ্গি থিয়েটার টিকেছিল নয়-নয় করে ২৬ বছর। মিসেস এস্থার লিচ বলে এক অভিনেত্রীর দৌলতে চৌরঙ্গি থিয়েটারের নামডাক সাগরপাড়ি দিয়েছিল। একদিনে তিনটে নাটকে ছ’টা চরিত্রেও নাকি অভিনয়  করেছেন এই নটী। আমরা একে কুয়োর ব্যাং, তায় প্রাদেশিক। নইলে ২০১০ সালের ১০ জুলাই তাঁর দ্বিশততম জন্মদিন উদ্‌যাপন করাই যেত। কেউ করিনি। বিনোদিনী দাসী ছাড়াও যে আমাদের থিয়েটারে একজন প্রিমাদোনা থাকতে পারেন, সেই বোধটাই যেন বিসর্জন দিয়েছি।

অথচ সাহেবদের থিয়েটারে তো বটেই কলকাতার প্রোসেনিয়াম থিয়েটারের ইতিহাসে মিসেস লিচের যা অবদান তা বিনোদিনীর চাইতে কোনও অংশে কম না। চোরঙ্গি থিয়েটার পুড়ে যাবার কিছুদিনের মধ্যেই সাহেবপাড়ায় নতুন থিয়েটারের গোড়াপত্তন হল। আজকের রাজভবনের পুব দরজায় দাঁড়িয়ে বাঁ দিকে তাকালে যে বিরাট সাতমহলা স্বপ্নপুরী তার ঠিক পাশেই গভর্নমেন্ট প্লেস ইস্ট আর ওয়াটারলু স্ট্রিটের মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে এজরা ম্যানসন। সেখানেই মেসার্স থ্যাকার কোম্পানির বিখ্যাত দোকান ছিল। তার একতলায় ১৮৩৯ সালের ২১ আগস্ট খুলল সাঁ সুসি থিয়েটার। এমন স্টেজ, এমন ডেকোর, এমন অডিটোরিয়াম কলকাতা আগে দেখেনি। চারশো জনের বসার সুব্যবস্থা। স্টল, বক্স, আপার বক্স। টিকিটের দাম চার থেকে ছ’টাকার মধ্যে।

ক মাস রমরম করে চলেছিল সাঁ সুসি থিয়েটার। তারপর আরও দর্শকের মনোগ্রাহী হবার অভিলাষে পাড়ি দিয়েছিল পার্ক স্ট্রিটে। আজ যেখানে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের অডিটোরিয়াম, সেখানে। বড়লাট লর্ড অকল্যান্ড দিয়েছিলেন এক হাজার টাকা। মতিলাল শীল ৫০০ টাকা। কেউ ১০০, কেউ ৫০। এত করেও টাকা উঠল না বলে জমি বাঁধা দিয়েই থিয়েটার গড়ার কাজে হাত দিলেন লিচ। একেবারে ক্ল্যাসিক্যাল রোমান আর্কিটেকচারের অনুসরণে গড়া হয়েছিল নতুন নাটমঞ্চ। দেখতে কতক চৌরঙ্গির বিশপ হাউসের মতো। আগের ঠিকানায় পার্কিং লট ছিল না, আসা-যাওয়ার পথ ছিল একটাই। এবার সে সব সমস্যা দূর হল। ৪ মার্চ ১৮৪১ খুলে গেল ১০ নম্বর পার্ক স্ট্রিটের নয়া হদিশ। কানায় কানায় ভরে থাকতে প্রেক্ষাগৃহ। মিসেস লিচের অভিনয় থাকলে তো কথাই নেই। এমনই এক অভিনয়ের সন্ধেয় দুর্ঘটনার শিকার হলেন তিনি। আগুনে পুড়ে গেলেন। বাঁচানো গেল না তাঁকে। তবু বন্ধ হয়নি সাঁ সুসি। শত্তুরের মুখে ছাই দিয়ে ১৮৪৮ সালের ১৭ আগাস্ট সেখানে ‘ওথেলো’ মঞ্চস্থ হয়েছিল। তাতে নায়ক সেজেছিলেন বঙ্গসন্তান বৈষ্ণবচরণ আঢ্য। ইংরেজরা ব্যাপারটাকে ভালো চোখে নেয়নি, কাগজে তো যাচ্ছেতাই লেখা হয়েছিল, কিন্তু কলকাতার বনেদি বাবুদের উল্লাস সেদিন দেখে কে। বাংলা কাগজগুলোতে তো প্রশংসার বন্যা বয়েছিল।

এরপরও টিকেছিল সাঁ সুসি। কলকাতা যত বাড়ছিল, বিনোদনের পসরা যত খুলছিল, সাঁ সুসির আড়ম্বর তত কমছিল। ১৮৪৯ সালের ১৯ মে-র পর আর অভিনয়ও হয়নি। একদিন হঠাৎ ২ নভেম্বর ১৮৫৩ আগুনে পুড়ে খাক হয়ে গেল সাঁ সুসি। শেষ হল উপনিবেশের মাটিতে নাট্য বিনোদনের এক ঘটনাবহুল অধ্যায়ের। এরপরও কী থিয়েটার হয়নি? হয়েছে। সাহেবরাই বানিয়েছে। বানিয়েছে আরও অনেকে। তাতে নাটকের চাইতে গানবাজনা হয়েছে বেশি। অপেরা হয়েছে অনেক। মধ্য কলকাতার সিনেমা তো আদতে অপেরা হাউস হিসাবেই দোর খুলেছিল। সে অন্য ইতিহাস। তার অন্দরে আমরা এখন যাব না।

১৮১৭ থেকেই বাঙালি ইংরিজি শিখতে শুরু করেছে। শেকসপিয়ারকে চিনেছে। এক সময় তারা নিজেরাই নিজেদের মতো করে থিয়েটার করায় মন দিল। বাবুদের খোয়াব মোতাবেক অনেক অপেশাদার উদ্যোগ মাথা চাড়া দিল। তারপর চৌরঙ্গি, সাঁ সুসির মডেলকে গড়েপিটে ১৮৭০-এর দশক থেকে গড়ে উঠল তথাকথিত ‘পেশাদার’ বাংলা রঙ্গমঞ্চ। সে কথা এ পত্রিকার অন্যত্র সবিস্তারে বলা হয়েছে। কিন্তু আক্ষেপ কী জানেন, নিজেদের ঢাক নিজেরা পেটাতে গিয়ে আমরা অকৃতজ্ঞের মতো আচরণ করেছি। প্রভু গুহঠাকুরতা, অমল মিত্র, সলিল সরকার, সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়ের মতো কয়েকজন উৎসাহী নাট্য ঐতিহাসিক ছাড়া গত একশো বছরে আর প্রায় কেউই এই ব্যপারটায় ভালো করে নজর দিইনি। এ ধরনের উদ্যোগের মূলে থাকে অর্থকরী দিক। অথচ এ দিকটা একেবারেই অজানা থেকেছে। ফলে মৌলিক গবেষণার অবকাশ রয়েই গেছে।

আরও দুঃখের কথা কী জানেন, বিলিত কেতার এই জমজমাট থিয়েটার কালচারের পাথুরে প্রমাণ দূরে থাক, কাগুজে প্রমাণ দাখিল করাই এখন দায় হয়েছে! সাহেবি আমলের খবরের কাগজে এন্তার এ সবের বেত্তান্ত বেরত, সে সব কিছু আছে। নতুন নাটক নামালে থিয়েটারওয়ালারা ইংরিজি কাগজে ইনসারশন ছাপতেন। তারও কতিপয় নমুনা এদিক-ওদিক ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। বোধকরি ন্যাশনাল লাইব্রেরির অ্যানেক্স বিল্ডিং-এ হত্যে দিয়ে পড়ে থাকলে আরও কিছু মিলবে। ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে তেহকিকাত চালাতে পারলে তো সোনার খনি মিলতে পারে। আর পোস্টার বিলক্ষণ ছিল। পাওয়া যায়নি। টিকিট? উঁহু। তবে হ্যাঁ, খুঁজে পেতে দুয়েকটা হ্যান্ডবিল মিলেছে। কিন্তু সব মিলিয়ে এত হাতে গোনা যে একটা ছোটোখাটো ফোল্ডারও ছাপা যায় না। ব্যাপারটা হয়েছিল কী, এ সব থিয়েটারে যাদের বুটের ধুলো পড়ত তারা কলকাতায় এসেছিলেন হয় চাকরি করতে নয় চাট্টি করে খেতে। এখানকার থিয়েটারকে তারা লন্ডনের অক্ষম অনুকরণ বলেই জ্ঞান করতেন। নেহাত সান্ধ্য বিনোদনের প্রয়োজন ছিল, তাই ভিড় করেছেন। প্লেহাউস থকে বেরোনোর পর ও-সব তারা মাথায় রাখেননি। একটা সময় থিয়েটারের প্রসঙ্গ পাবার আশায় সাহেব-মেমদের ছেপে বেরোনো জার্নাল গোগ্রাসে গিলেছি। এক-আধ-লাইনের বেশি লেখা হয়নি।

আর ছবি? বলবেন না মশায়। মানছি সে আমলে ফোটোগ্রাফি আসেনি, কাজেই বোর্ন অ্যান্ড শেফার্ডের ভাঁড়ার ঢুঁড়ে কোনও হারামণি মিলবার আশা করি না। ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে রাখা সাঁ সুসির একটা সাদা-কালো ছবি ছাড়া আর কোনও ফোটোগ্রাফ আমাদের চোখে পড়েনি। কিন্তু শত বছর ধরে একটা নাট্যসংস্কৃতি  বেঁচেবর্তে রইল, গন্ডায় গন্ডায় ইয়োরোপিয়ান কপাল ঠুকে কলকাতায় পা দিয়ে কাঁড়ি কাঁড়ি ছবি আঁকলেন, চিৎপুরের রাস্তা থকে জেলেপাড়ার সং সব তুলিকালিতে ধরা রইল, সাহেবপাড়ার প্লেহাউসের একটা পেইন্টিং খুঁজেপেতে পাওয়া গেল না? না, সত্যিই যায়নি। অনুমান করি, প্রোসেনিয়ামের সিন আঁকার বরাত পেতেই অভ্যস্ত ছিলেন আর্টিস্টরা, খামখা বারমহল-অন্দরমহলের ছবি আঁকতে যাবেন কোন দুঃখে?

নিদেনপক্ষে এক-আধটা স্কেচও কি করে যাননি কেউ? তবে একটা লিথোগ্রাফ প্রিন্ট পাওয়া গেছে। ব্যালিন বলে এক চিত্রকর উত্তর-পশ্চিম  দিক থেকে সাঁ সুসির একটা ছবি এঁকেছিলেন। তার ডগারোটাইপ প্রিন্ট ওয়েলসলি প্লেসের এক ছাপাখানা থেকে বেরিয়েছিল। নিশ্চয় সে সবের একটা বাজার ছিল, একটা কদর ছিল। নইলে কী আর ছাপাখানার বস্তু হয়? আর একটা জিনিস পাওয়া গেছে। একটা ড্রয়িং। সাহেব-মেমের সাধের প্লেহাউসগুলোর গড়ন কেমন ছিল তার সবেধন নীলমণি সাবুদ লন্ডনের ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে রক্ষিত হলদে হয়ে আসা ওই ২৩ বাই ৩৫ সেন্টিমিটার মাপের ড্রয়িং।

১৮৩০ সালে চৌরঙ্গি থিয়েটারে বসে এই কালি-কলমের ড্রয়িং করেছিলেন উইলিয়াম প্রিন্সেপ (১৭৯৪-১৮৭৪)। না, ইনি প্রিন্সেপ ঘাটের প্রিন্সেপ নন। তবে ভারততত্ত্ববিদ জেমস প্রিন্সেপের সঙ্গে তাঁর রক্তের সম্বন্ধ ছিল। উইলিয়াম প্রিন্সেপ কাজ করতেন পামার অ্যান্ড কোম্পানির সওদাগরি আপিসে। সমাজের হোমড়াচোমরাদের সঙ্গে ওঠা-বসা ছিল। দেশি নব্যধনীদের মধ্যে প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের সঙ্গে খাতির জমেছিল খুব। এমনিতে শৌখিন মেজাজের মানুষ। আনাগোনা ছিল থিয়েটারের অন্দরমহলেও। ১৮৩৫ সালে দ্বারকানাথ যে চৌরঙ্গি থিয়েটার কিনে নিয়েছিলেন তার পেছনেও এই করিৎকর্মা বন্ধুটির হাতযশ ছিল। যে ড্রয়িংটার কথা বলছিলাম সেটার ওপর আর মাউন্টের ওপর সাহেব কয়েক লাইন লিখে রেখেছিলেন। আমাদের কাছে তা অন্ধের যষ্টির সামিল। তা থেকে জানা যাচ্ছে চৌরঙ্গি থিয়েটারে হাজার খানেক দর্শক আসন ছিল। আটশো জন বসতেন বক্সে, শ দুয়েক বসতেন পিট-এ। অডিয়েন্সের মাঝামাঝি বসে ‘ব্লাইন্ড বয়’ নাটকের শেষ দৃশ্যের মঞ্চসজ্জার লে-আউট করেছিলেন উইলিয়াম প্রিন্সেপ। সামনে দেখা যাচ্ছে হেলান দেওয়া রেস্ট বেঞ্চের সারি। কাউন্সিলরদের জন্য আর গভর্নর জেনারেলের জন্য আলাদা আলাদা বক্স। ১৮৩০ সাল, অর্থাৎ রাজভবন দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক। মন চাইলে বলরুমের বিনোদন থেকে ছুটি নিয়ে মাইল খানেক উত্তর-পুবে চৌঘুড়ি হাঁকিয়ে চৌরঙ্গি থিয়েটারের উঠোনে তিনি মাঝেসাঝেই নামতেন, এমনটা ধরে নিতে অসুবিধা নেই।

আর্কিটেকচারাল ড্রয়িং-এ পাকা হাত উইলিয়াম প্রিন্সেপের। ছবি থেকে স্পষ্ট যে আঠারো-উনিশ শতকে লন্ডনে ড্রুরি লেন মহল্লায় যে ধরনের থিয়েটার আর্কিটেকচারের চল ছিল তার ধাঁচেই গড়া হয়েছিল চৌরঙ্গি থিয়েটার। প্রায় তিন দিক খোলা এপ্রন স্টেজ। তিন সারে সাজানো দর্শকাসন। তাদের নাকের ডগায় দৃষ্টিকে অংশত আটকে দিয়ে করিন্থিয়াল ক্যাপিটাল-ওয়ালা দশটা উঁচু থাম উঠেছে স্টেজের ওপর। ধরে রেখেছে গম্বুজওয়ালা বাহারি ছাদকে। আঁধারে আলো দেখাতে ঝুলছে হাজার বাতির তিনটে ঝাড়লণ্ঠন। স্টেজের পেছনে হাতে আঁকা ড্রপসিন। তার সামনে ঝালর লাগানো কার্টেন। স্টেজের দু পাশ দিয়ে এন্ট্রি-এগজিটের দরজা। তার টঙে বড়লাট-কাউন্সিলরদের বসার বক্স।

ইশ, এমন দু-চারটে ছবি যদি আরও পাওয়া যেত।

সৌজন্য: কোরক সাহিত্য পত্রিকা, শারদ ২০১৩, বাংলা নাটক ও নাট্যমঞ্চ।

শেয়ার করুন