Kojagori Natok Theke Natya

কোজাগরী – নাটক থেকে নাট্য

শেয়ার করুন

পশ্চিমবঙ্গে শাসক তখন বামফ্রন্ট সরকার। ২০০৬ সালে তাঁরা ক্ষমতায় আসার সময় স্লোগান রেখেছিল “শিল্পায়ন আমাদের ভবিষ্যত আর কৃষি আমাদের ভিত্তি”। মানুষ ভোট দেয় এবং আশাতীত সংখ্যা গরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসে। শিল্পায়নের প্রথম ধাপ হিসাবে সিঙ্গুর কে বেছে নিয়ে তিনফসলি জমি তুলে দেয় টাটা দের হাতে, গাড়ী তৈরী হবে সেখানে। শুরু হয় প্রতিরোধ, সরকার দমে না। মুখ্যমন্ত্রীর মুখে উচ্চারিত হয় ওরা ৩৫ আর আমরা ২৩৫। কৃষক দের লড়াই এর পাশে এসে দাঁড়ান বিভিন্ন স্তরের মানুষ। এসে পড়ে ২০০৮ সাল। নন্দীগ্রামে কেমিক্যাল হাব এর জন্য কৃষি জমি নেওয়া বলে নোটিশ পড়ে। আবার মানুষের প্রতিরোধ। তৈরী হয় নানান কমিটি। ৩৪ বছরের বাম শাসনে এই প্রথম সরকার মানুষের প্রতিরোধের মুখে। প্রশ্নের মুখে দিশাহারা। চলে লাঠি, গুলি, টিয়ারগ্যাস। মৃত্যু হয় বেশ কিছু মানুষের। গোটা পশ্চিমবঙ্গে যুদ্ধ পরিস্থিতি। গণ-মাধ্যম গুলো দিশাহারা। শাসকের পক্ষে প্রচার করতে গিয়ে TRP কমে যাচ্ছে। ধীরে ধীরে গণ-মাধ্যম ঘুরতে বাধ্য হলো। গণ-মাধ্যমে প্রতিদিন আলোচনায় আসছেন আজকের মন্ত্রী-সান্ত্রী রা। প্রতিদিন বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রশ্নে অসহায় হয়ে পড়ছেন তাঁরা। প্রতিদিন তাদের বলা হচ্ছে “আপনি তৃণমূল”। তখনও তারা দিকভ্রান্ত, উত্তর দিতে পারছেন না। যদিও ২০১১ এর নির্বাচনের আগে তারা বলতেও পেরেছেন, মন্ত্রী ও হয়েছেন ।

ঠিক সেই সময় থেকেই আমার সাইলাস টিম্বারম্যান কে মনে পড়তো। ১৯৫০ সালে, আমেরিকার প্রেক্ষাপটে লেখা কিন্তু ২০০৮ এ আবার নতুন করে পড়ে হতে লাগলো এতো গতকাল লেখা। কিন্তু যদি নাটক হয় তবে তা কোন দল করবে? তখন আমি যে দল দুটোয় অভিনয় করি তারা প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক নাটক করতে আগ্রহী নন, কেউ আশ্রয় খুঁজছেন লালনে কেউ বা মহাভারতে। খুঁজতেই পারেন। কিন্তু আমি খুব অস্থির হয়ে পড়ছি। কে আমার কথা শুনে এই নাটক করবে। দুটি দলের অভিনয় শেষে আমি তখন দলহীন। দেখা হয়ে গেল পুরোনো এক বন্ধুর সাথে। কল্যান। দু-জনে মিলে ঠিক করলাম নাটকের দল গড়বো। নাম হলো “অভিমুখ”। হাজরার কাছে এক কোচিং সেন্টারের ছোট্ট ঘরে বসা শুরু। ইতিমধ্যে উপন্যাসটির নাট্যরূপ দিতে সম্মত হয়েছেন শ্রী কৌশিক চট্টোপাধ্যায় ।

আমরা যখন সাইলাস টিম্বারম্যান নাটক করবো বলে ভাবছি অর্থাৎ ২০১৫, তখন কিন্তু পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। অদ্ভুত ভয়ের বাতাবরন চারদিকে। মানুষ স্বাধীন ভাবে মত প্রকাশ করতে পারছেন না, কাজ করতে পারছেন না, প্রতিবাদ করতে পারছেন না। শুধু বন্দনা করো, বন্দনা। তাহলেই তুমি শ্রেষ্ঠ, তুমি সুন্দর, তুমি পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য। প্রতিবাদ করলেই তুমি মাওবাদী নতুবা সি.পি.এম ! যে মানুষের ভোটে জিতে মন্ত্রী হলেন তাঁদেরকেই বলছেন “ঐ মাওবাদীকে ধরুন, আমি জানি ও মাওবাদী!” কেন সারর দাম বাড়লো এই প্রশ্ন করার অপরাধে তিনি মাওবাদী। ধর্ষিতা বান্ধবীর পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে শাসক কে কিছু প্রশ্ন করার অপরাধে দুটি মেয়ে মাওবাদী! শ্রমিক-কর্মচারীরা ধর্মঘট করলে মাইনে কেটে নেওয়া হচ্ছে। অথচ এরাই একদিন ধর্মঘটে অচল করতেন রাজ্য। শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান গুলোতে শুরু হলো শাসক দলের ইউনিয়ন এর দাদাগিরি। কেউ বাদ গেলেন না। শিক্ষক, অধ্যাপক, অ-শিক্ষক কর্মচারী, কেউ প্রহৃত হচ্ছেন কেউ বা হুমকির মুখে পড়ছেন। এতো গেলো একটা দিক। অন্য দিকে উন্নয়নের নামে চলতে থাকলো মহাযজ্ঞ। যা হচ্ছে মেনে নাও। উন্নয়নের নামে অবাধ বৃক্ষ নিধন যজ্ঞ, কারন উন্নয়ন মানে রাস্তা মানে শপিং মল ইত্যাদি। আপনি প্রশ্ন করছেন কি মরেছেন। মেনে নাও। মানুষ ক্রমশঃ নিজেকে গুটিয়ে নিতে চাইছে, ছোটো করে নিতে চাইছে, মিশে যেতে চাইছে চলতি হাওয়ায়। যে প্রবনতা বিশ্বব্যাপী। কাজের নির্দিষ্ট সময়ে দাবিতে যে আল্দোলন কে ভুলতে বাধ্য করে ১২ ঘন্টা ১৪ ঘন্টা কাজ। তাতেও রেহাই নেই। বাড়িতে গিয়েও অফিসের কাজ করো। ২৪ ঘন্টাই মার্কেটে থাকো। অবশ্য বিনিময়ে ল্যাপটপ, ইনসেনটিভ, বিদেশ ভ্রমণ। কি পাবেন না আপনি? কিন্তু মানুষের মানুষ হওয়ার ইতিহাস কি বলে? এমনটা তো হওয়ার কথা ছিল না। কি এমন ঘটে গেলো? উত্তর খুঁজছে যে যার মতো করে।

আমাদের মনে হয়েছিল মানুষের আজ প্রধান সমস্যা তাঁর ভিতরের ভয় কে জয় করতে না পারা ।সে যা বলতে চাইছে, সাহস করে তা যেন বলতে পারছে না। বারংবার তাঁর মনে হচ্ছে সে আজ একা। বাস্তব ও তাই বলে। কিন্তু আবার এটাও সত্যি যে যুগে যুগে এই মানুষই পাল্টে দিয়েছে বাস্তবতা। তৈরী করতে পেরেছে নতুন বাস্তবতার ইতিহাস। এই প্রেক্ষিতে দাঁড়িয়ে অভিমুখ বেছে নিয়েছে হাওয়ার্ড ফাস্টের সাইলাস টিম্বারম্যান অনুসৃত “কোজাগরী”, সঙ্গী হয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। মুখ লুকিয়ে থাকা, নির্বিবাদে বাঁচতে শিখে নেওয়া মানুষ কে হাত ধরে টেনে নামিয়েছেন পথে।

সমস্যা হলো, এই রকম একটি আদ্যান্ত রাজনৈতিক বিষয়কে কিভাবে দলের ছেলে-মেয়ে রা? কারন এখন বেশীর ভাগ মানুষই তো রাজনীতি থেকে নিজেকে দূরে রাখেন, নিউজপেপারে পলিটিকাল রিপোর্ট সযতনে এড়িয়ে চলেন, অক্লেশে বলে ফেলেন রাজনীতি কে তিনি ঘৃণা করেন। আমাদের এই নিস্পৃহতা যে আমাদের আরো খাদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে তা বুঝতে বড্ড বেশী সময় নিয়ে ফেলি আমরা। এই রকম পরিস্থিতিতে অন্যান্য দের এই বিষয়ের মধ্যে প্রবেশ করানো টাই ছিলো একটা বড় চ্যালেঞ্জ। আমাদের হাত ধরলেন শ্রী কৌশিক চট্টোপাধ্যায়। দীর্ঘদিনের নাটক করানোর, ওয়ার্কসপ করানো অভিজ্ঞতা কে কাজে লাগালেন। রাজ্য, দেশ, পৃথিবী, বর্তমান পরিস্থিতি, কোন বিপদের মুখে দাঁড়িয়ে আমরা, কি করা উচিত আমাদের, এসবের ধারে কাছেও গেলেন না শুরু করলেন এক একটা চরিত্র ধরে বিশ্লেষন। কেন এমন এই মানুষ টা? কোন কারনে তিনি এমন হলেন? তাঁর অতীত কি রকম ছিল? কি ভাবে তিনি যুক্তি খুঁজছেন? এই ভাবে শুরু হলো খনন কার্য । দলের যে সদস্যরা কয়েকদিন আগে নাটকটিতে নাটকীয়তা কম বলে ভালোবাসতে চাইছিলেন না, তাঁরাই পরম আদরে চরিত্র গুলো নিয়ে কাঁটা-ছেঁড়া করতে থাকলেন। চরিত্রের ভিতরকার সত্য কে খুঁজতে চাইলেন। কৌশিক চট্টোপাধ্যায় প্রতিদিন একবার করে মনে করিয়ে থাকলেন “তোমরা সত্য হও। মিথ্যে অভিনয়ের আশ্রয় খুঁজো না”।

চরিত্র নির্মানের এই পর্যায়ে মন এর সাথে চলতে থাকলো শরীরিভাষা খুঁজে বের করার অনুশীলন। যে মানুষ গুলো মহলার একঘেয়েমি থেকে পালাতে চাইতো, তাঁরাই প্রতিদিন মহলায় জীবন্ত হয়ে উঠতে থাকলো। নিজেদের অজান্তেই চরিত্র হয়ে ওঠার খেলায় মেতে উঠলো। এরপর দেওয়া হলো সংলাপ। সবাইকে কৌশিক দা বলে দিয়েছিলেন “সংলাপ মুখস্থ করবে না”। ততদিনে সবাই বিশ্বাস করে ফেলেছে মহলা পদ্ধতিতে। এতদিন ধরে চলা (৬ মাস) ওয়ার্কসপের এর ভিত্তিতে সবাই যখন সংলাপ বলছে তখন সে আশ্চর্য ব্যাপার। সত্য এসে দাঁড়াচ্ছে সামনে, আবার চলেও যাচ্ছে। আবার ও তাকে খোঁজাটাও চলছে। আমাদের মনে হয়, আজও বিশ্বাস করি এই খোঁজাটাকে বাঁচিয়ে রাখাটাই “কোজাগরী”র মূল শক্তি। সকলেই যে এই মহলা পদ্ধতির মধ্যে দিয়ে সমাজ-সংসার-রাজনীতিতে সমান উৎসাহিত হয়ে পড়েছে এমন অনায্য দাবী আমরা করছি না। কিন্তু আমরা যে সকলে অনেকটা বদলাতে পারলাম নিজেদের, এ দাবী করতেই পারি।

বদলটা তাহলে কোথায় হলো? থিয়েটার কে দেখার প্রশ্নে, নিজের জীবনকে দেখার প্রশ্নে, সহশিল্পীকে ভালোবাসার প্রশ্নে, এইরকম অনেক গুলো দেখার দৃষ্টি আমাদের বদলে দিয়েছেন শ্রী কৌশিক চট্টোপাধ্যায়। যে মেয়েটি তাঁর জীবনে কিছুই গোছাতে পারছিল না, সে আজ অন্তত গোছানোর চেষ্টা করতে শিখেছে, আমরা যারা থিয়েটারকে দেখতাম খানিকটা বৈভবের মোড়কে তাদের কৌশিকদা শিখিয়েছেন কত সরল ভাবে, সহজ ভাবে থিয়েটারে নানা আঁকে-বাঁকে লুকিয়ে থাকা আশ্চর্য কে খোঁজার চেষ্টাকে জীবনের অঙ্গ করে এগিয়ে চলা যায়। আমরা কৃতজ্ঞ এই মানুষটির কাছে ।

“কোজাগরী” আজ পশ্চিমবঙ্গে একটি মঞ্চসফল প্রযোজনা। আমরা আমাদের বিশ্বাস আপনাদের সামনে উপস্থাপন করতে পেরে নিজেদের ধন্য মনে করি প্রতিটি শো-এর শেষে। এটাও মনে মনে ধারন করে রাখি, এখনও অনেক পথ চলার বাকী…… অনেক কথা বলার বাকী।

শেয়ার করুন