জাগানিয়া মৃতজন – নাটক থেকে নাট্য

শেয়ার করুন

হেনরিক ইবসেন-এর ‘হোয়েন উই ডেড অ্যায়েকেন’ নাটকটি তাঁর জীবনের একদম শেষ নাটক। সেই নাটকের সত্য ভাদুড়ি কৃত বঙ্গানুবাদের নাম তিনি দেন- “আমরা মৃতেরা যখন জাগি”। তারপর সেই নাটক সম্পাদনা করা এবং বিভাস চক্রবর্তী মহাশয়ের সঙ্গে নাটকটা নিয়ে আলাপ-আলোচনার পর, তাঁরই দেওয়া নাম- “জাগানিয়া মৃতজন” নামে যাদবপুর মন্থন যখন প্রযোজনা করে, তখন, দলের পক্ষ থেকে একটি নাটকই শুধু প্রযোজনা করা, শুধুমাত্র সেই উদ্দেশ্যই ছিল না। এই নাটকের মধ্যে দিয়ে, আমরা এটাও বলবো না যে সমসাময়িক সমাজকে ছুঁতে চেয়েছি, কারণ, এই নাটকের আমরা কোনো বঙ্গীকরণ করিনি। যেটা করেছি সেটা হলো, মূল নাটকটাকে অবিকৃত রেখে, তার স্থান-কাল-পাত্রকে অবিকৃত রেখে, তার ভেতরের মনটাকে ধরতে চেয়েছি। একজন শিল্পী তাঁর প্রথম যৌবনে, শিল্পচর্চার যে আগুন তাঁর মধ্যে চাড়িয়ে গিয়েছিল, যাকে সে এই পৃথিবীতে একটা অনবদ্য রূপ দিতে চেয়েছিল অথচ যে নারীকে মডেল করে সেই মূর্তি সে গড়ে তুলতে চেয়েছিল, তাকে ভালোবেসেও শুধুমাত্র পাপবোধে তাকে দিনের পর দিন নগ্ন পেয়েও, ছুঁতে চায়নি। এই জায়গা থেকে, শেষজীবনে যখন তার সাথে আবার দেখা হয়, তার প্রতি করা অন্যায়, তার ভালোবাসাকে মর্যাদা না দেবার পাপস্খলন, খ্রীষ্টধর্মীয় মিথ অনুযায়ী যাকে বলা হয় রেজারেকশন বা পুনরুথান, যীশু আবার ফিরে আসেন মৃত্যুর কিছুদিন বাদে সেই মিথকে ধরে রেখে ইবসেন যে এক শিল্পীর মনকে বিশ্বের দরবারে হাজির করলেন, আমরা শুধুমাত্র একটি প্রযোজনা করার উদ্দেশ্যে সেইটা নিয়ে কাজ করিনি, আমরা ধরতে চেয়েছি, একজন শিল্পী দেশ, কাল, পাত্রভেদে, সময়ভেদে একই থাকেনা। আমাদের তমাল যখন নাটকটা থেকে নাট্য বা প্লে টু প্রোডাকশন নিয়ে বলতে বলে ও তারজন্য ‘জাগানিয়া মৃতজন’ নাটকটাই বেছে নিল তখন বারবার একটা প্রশ্নই আমার জেগে উঠেছে যে এই নাটক থেকে নাট্যে রূপান্তর অর্থাৎ যেখানে নাট্যকার বা অনুবাদক তাঁর কাজ শেষ করে দিয়েছেন, তারপর নির্দেশক হিসেবে আমার কাজ শুরু হয়ে গেল, সেখানে শুধুমাত্র স্ক্রিপ্টের সংলাপ আমার অভিনেতাদের মুখস্থ করিয়ে একটি কম্পোজিশনের মধ্যে ফেলে একটা ডিজাইন তৈরি করে একটি নাট্য তৈরি করা নয়, এর মধ্যে দিয়ে নির্দেশক হিসেবে আমার ব্যাক্তিসত্তা বা আমার থিয়েটারের চলন, আমার নিজের থিয়েটারের বোধ, থিয়েটারের শিক্ষা এই সমস্তটাকে আলাদা আলাদা করে না করেও বলা চলে এই কাজটার মধ্যে চাড়িয়ে দিতে হয়েছে। অর্থাৎ এতগুলো লেয়ারকে নিয়ে আমাদের কাজ করতে হয়েছে।

আমি যখন এই কাজটা করতে যাই, প্রথমেই আমার যেটা ভালো লাগে, দেবেশ চট্টোপাধ্যায় এই নাটকের সিনোগ্রাফি করতে এসে প্রথমদিনই আমাকে প্রশ্ন করেন, “তুই এই নাটকটা কেন করতে গেলি? এটা তো আমাদের যাদের বয়স হয়ে যাচ্ছে আস্তে আস্তে- আমরা যারা শিল্পকে দীর্ঘদিন দেখা, দীর্ঘদিন শিল্পচর্চা করার পর যে বোধে পৌছেছি সেখান থেকে এই নাটকটা আমরা দেখতে চাই, দেখতে পাই, তুই এই বয়সে কেন এই নাটকটাকে নিলি?” আমি সেদিনও দেবেশদাকে একটা কথাই বলেছিলাম যে আমি প্রথম যখন নাটকটা পড়ি, পড়তে পড়তে রুবেকের কিছু চলনের সঙ্গে আমি নিজের চরিত্রের কিছু মিল পাই, বা সংলাপে হুবহু মিলে যায়, আমি যে সেই সংলাপ গুলো কাউকে বলেছি কোনোদিন জীবনে তা নয়, আমি যে সবকটি সংলাপই বিশ্বাস করি তাও নয়, কিন্তু আমার মনে হয়েছে যেন আমার মনের কথা বলছে। ঘটনাচক্রে যখন আমি নিজে এই চরিত্রটা অর্থাৎ রুবেকের চরিত্রে অভিনয় করি, তখন আমার এক ছাত্র আমাকে বলে, “এ তো তুমিই, তুমি যখন মঞ্চে উঠে এই কথাগুলো বলো, তখন আমার মনে হয় আমি যেন সত্যিকারের রুবেকের কথাই শুনছি”। আমরা তো কবি-সাহিত্যিক কাছে এইজন্যই ঋণী যে তারা আমাদের মনের কথাকে ভাষায় রূপ দেন, কিন্তু এই নাটকটার ক্ষত্রে আমি যে শুধুমাত্র এই চরিত্রটার সাথে রিলেট করতে পেরেছি তা নয়, সাথে আরো যে চরিত্রগুলো আছে অর্থাৎ- মাইয়া, আইরিন বা উলফেইম, আমি এই প্রত্যেকটি চরিত্রের সাথেই নিজেকে রিলেট করতে পেরেছি আশ্চর্যজনকভাবে! তাই সবকটি চরিত্রই আমার হয়ে ওঠা হয়ে গেছে। আমার বিশ্বাস ইবসেনও নিশ্চয়ই এটা দেখতে চেয়েছিলেন, দেখতে পেয়েছিলেন, ইবসেন শুধুমাত্র নিজের কথা বলতে চাননি বা নিজের জীবনে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা এখানে বিবৃত করতে চাননি, উনি একটা বোধের একটা উপলব্ধির কথা সারাজীবনের অভিঞ্জতা দিয়ে তাকে ছুঁতে পারছি যা ক্লাসিকের মহৎ গুণঃ যুগের পর যুগ বয়ে গেলেও যার আবেদন কখনো শেষ হবার নয়। তাই তাঁর মৃত্যুর এতবছর পরেও ভারতবর্ষের এক নগরে দাঁড়িয়ে আমরা এই নাটকটিকে এইভাবে ছুঁতে ইচ্ছা করেছে।

এই নাটকটা করতে গিয়ে করেছি তা হলো- ইবসেনের মূল নাটকটা একটা স্পা বা স্বাস্থ্যনিবাস বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে শুরু হয়ে পাহাড়ে যায়। আমি সেই স্বাস্থ্যকেন্দ্রটাকে মনোবিকার রুগীদের নিবাস বানিয়েছে অর্থাৎ একটা অ্যাসাইলাম যেখানে সবাই নিজের চিকিৎসা করতে আসেন। মনের চিকিৎসা। শুধুমাত্র মাইয়া মানে আর্নল্ড রুবেকের স্ত্রী, সুস্থ। মানে সো-কলড সুস্থ। সে ছাড়া সবাই নিজের চিকিৎসা করাতে আসেন, রুবেক নিজে, আইরিন, উলফেইম- প্রত্যেকে। কিন্তু কোনো জায়গা থেকেই আমি খুব স্পষ্টভাবে সে ঘোষণা করিনি। এমনকি এটি যে একটি মনোবিকলন কেন্দ্র সেটাও আমি কোথাও স্পষ্টত বলিনি। শুধুমাত্র চরিত্রদের আচার-আচরণে তা বোঝা যায় আর কিছু কিছু সংলাপে। এখানে খোদার ওপর খোদকারিই করেছি বলা চলে, যেমন এক জায়গায় ইবসেনে আছে যে স্পা-এর ম্যানেজারকে রুবেক জিঞ্জাসা করেন, “উনিও কি রুগী?”, তখন তিনি বলেন, “না। আমার কাছে তেমন কোনো খবর নেই”। আমার নাট্যে ম্যানেজার কিন্তু বলে, “কী জানি! আমি ঠিক জানি না”। এই ধোঁয়াশাটা রাখতে রাখতে এর বিচার বা সিদ্ধান্তের ভারটা দর্শকের ওপর ছেড়ে দিয়েছি। উলফেইমের আচরণে তাকে তো অ্যাসাইলামের অধিবাসী বলেই মনে হয়! অন্তত আমার তো মনে হয়েছে। আইরিনকে তো মনে হয়েইছে আর রুবেকও তাই-ই। তো সেই জায়গা থেকেই এটাও একটা স্তর বা লেয়ার আমি বারবার করতে চেষ্টা করেছি। নাটক থেকে নাট্যে রূপান্তরের সময় ডিজাইনের ক্ষেত্রে যে কাজটা আমি করেছি সেটা হলো, কোনো পাহাড় বা কোনো স্বাস্থ্যনিবাসের হুবহু প্রতিরূপ আমি মঞ্চে রাখিনি। সেটাকে ভাঙতে চেয়েছি কিছু ব্লকের ব্যবহার আর পিছনে একটা ব্যাকড্রপের ব্যবহার করে। ব্যাকড্রপটার মধ্যে একটি নগ্ন-নারীমূর্তি ভাসমান অবস্থায় রয়েছে। রুবেক একসময় তার সারাজীবন ধরে খুঁজে চলা রমণী আইরিনকে একথা বলছেন যে, “আমি এমন এক মূর্তি গড়তে চেয়েছি যে পবিত্র, যে মৃত্যুর অন্ধকার থেকে জাগছে”। ওই ব্যাকড্রপেও অন্ধকার থেকে জেগে ওঠা এক নারীর চিত্র খুব আবছা ভাবে রয়েছে। আর পাহাড়কে চিত্রায়িত করতে চেয়েছি কিছু ব্লকের অসমতল ব্যবহারে। পাশাপাশি বা এক্টার ওপর আরেকটা বা কখনো বিচ্ছিন্ন অবস্থায় সেগুলো মঞ্চে ছড়িয়ে থাকে এবং সবশেষে একটি মৃত্যুর প্রতীক রূপে দেখা দেয় সমস্ত ব্লক জুড়ে মঞ্চের মাঝামাঝি এক বিশাল কফিন হয়ে। এক কথায় অ্যাবস্ট্র্যাক্ট ফর্মে আমি মঞ্ছটাকে সাজাতে চেয়েছি। পৃথিবী জুড়ে হয়ে চলা ইবসেনের এই নাটকের বিভিন্ন প্রযোজনা আমি ইউটিউবে দেখতে পেয়েছি, সেগুলো সবকটি তো মঞ্চে চাক্ষুষ করা সম্ভব নয় বলাই বাহুল্য। একটি প্রযোজনা আমাদের দেশেই খুব বিখ্যাত হয়ে আছে রতন থিয়মের, উনি তো সবসময়ই নিজের মনিপুরি কালচারটাকে ডিকোড করেন সেখানে ফেলেই তিনি সব নাটককে দেখতে চান কিন্তু আমি এখানে এমন এক স্পেসে নিয়ে যেতে চায়েছি যে স্পেসটা পৃথিবীর যেকোনো দেশ, যেকোনো প্রান্ত হতে পারে, এমন একটা স্পেস যেখানে গিয়ে নাটকটা পৃথিবীর সমস্ত মানুষের মনের কথা হতে পারে, সমস্ত সম্পর্কের আদি থেকে অন্তের কথা হতে পারে।

পোশাকের ক্ষেত্রেও লক্ষণীয়, একমাত্র মাইয়া ছাড়া, খুব সাধারণ পোশাক পরে কেউ নেই। যেহেতু সে একমাত্র সুস্থ। যেমন উলফেইমের সারা শরীরে চেইন বা শিকলের বহুল ব্যবহার করেছি, আইরিন লেখককৃত সাদা পোশাক পরে থাকলেও সেটা গাউন এবং নানা লেয়ার যুক্ত। নানকে নানের পোশাক না পরিয়ে প্রায় আইরিনের মতো একটি গাউন পরাই যেন তারই ‘হয়তো বা’ একটি অল্টার ইগো। রুবেক পরেন একটি লং-স্কার্ট সাথে লং-জ্যাকেট। তার মেক-আপে আমি ধরতে চেয়েছি ইবসেনের একটা আদল। আমি বলতে চাইনি এটা ইবসেনেরই আত্মজীবনী, তার ধৃষ্টতাও আমার নেই, শুধু মেক-আপে কোথাও একটু ছুঁয়ে যেতে চেয়েছি।

কোরাসকে আমি এই নাটকে ব্যবহার করেছি কখনো স্বাস্থ্যনিবাসের অধিবাসী হিসেবে, কখনো আদিবাসী হিসেবে বা কখনো বিমূর্ত মূর্তি হিসেবে। বলা যায় প্রায় পিরোটাই একটা অ্যাবস্ট্রাক্ট ফর্মে এই নাটককে আমি নাট্যে রূপান্তর করেছি। জানিনা কতটা সফল হয়েছি। আমার বিশ্বাস আগামি দিনেও আরো নানাভাবে ইবসেন অনূদিত হবেন। ইবসেনের ‘হোয়েন উই ডেড অ্যায়েকেন’ অনূদিত হবে। ওই যে বললাম তাই তো এটা ক্লাসিক।

শেয়ার করুন