মরাগাঙে জোয়ারের আর এক নতুন নাম

“কোজাগরী” দেখে লিখেছেন – সৌমেন দাস।

শুরু হয়ে গেছে কাউণ্ট ডাউন – আসন্ন দুর্গোৎসব। না কাউণ্ট ডাউন শুরু হয়েছে বলেই হঠাৎ দুর্গা পুজোর কথা মনে পড়ে গেল তা নয়, আসলে মনে পড়ে গেল একটা নাটক দেখে। না এই নাটকটির সাথে আক্ষরিক অর্থে দুর্গা পুজো বা দুর্গার কোন সম্পর্ক নেই আবার একটা সম্পর্ক আছেও আমার মতো করে। হ্যাঁ পরপর অনেক গুলো থিমের ঠাকুর দেখার পর একটা সাবেকি, সনাতনী দুর্গা দেখলে মনটা যেমন ভরে যায়, উৎফুল্ল হয়ে ওঠে, তৃপ্তি দেয় – এই ‘কোজাগরী’ নাটকটা অনেকটাই সেই একই রকম অনুভূতি দিল। আবার এখানে একটা দ্বন্দ্বও তৈরি হল – তৃপ্তি অনেকটাই প্রতিবাদ, আন্দোলন, বিদ্রোহ বিমুখ করে তোলে। তবে কি এই তৃপ্তি তাই করবে? না এখানে ঘটনাটা আবার অন্য রকম কিছু ঘটলো। আরও বেশী করে উৎসাহিত করলো, উদ্দীপিত করলো এবং মনে করিয়ে দিল – সাম্প্রতিক অতীতে দেখা কমলেশ্বর মুখার্জী-র ‘মেঘে ঢাকা তারা’ চলচ্চিত্রে ঋত্বিক ঘটক ওরফে নীলকণ্ঠ বাগচি-র উচ্চারিত সেই অমোঘ সংলাপ – “ক্ষমতা কথা বললে জেহাদ কথা বলবে।” এবং “রাষ্ট্র থাকলে রাষ্ট্রদ্রোহিতা থাকবেই।”

হ্যাঁ প্রাসঙ্গিক। আজকের দিনে সমসাময়িক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বলা বাহুল্য সংসদীয় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সর্বকালে সব দেশে – হাওয়ার্ড ফাস্ট-এর ‘সাইলাস টিম্বারম্যান’ অনুসরণে ‘বেলঘরিয়া অভিমুখ’-এর নাটক ‘কোজাগরী’ ভীষণ রকম প্রাসঙ্গিক। ক্ষমতার উন্মত্ততায় সমস্ত কিছুকে কুক্ষিগত করে ফেলার হীন প্রয়াস। সমস্ত ক্ষেত্রকে ক্ষমতার অঙ্গুলি হেলনে পরিচালিত করার এক এবং একমাত্র বাসনা চরিতার্থ করার হীন ষড়যন্ত্র, চক্রান্ত আর তার বিরুদ্ধে সামান্যতম কোন প্রতিবাদ প্রতিরোধের সম্ভাবনাকে যেন তেন প্রকারেণ বিনাশ করে দেওয়ার সমস্ত কৌশল – এই নাটকের মূল বিষয়। না এর মধ্যে কোন নতুনত্ব নেই। তাহলে আছে কি? কেন এই নাটক? ওই যে বললাম ‘সাবেকি, সনাতনী!’ এই সময়ের বঙ্গে মানে পশ্চিম বঙ্গে যে থিমের দুর্গার মতো বিভিন্ন নাটক গুলো হচ্ছে তার মধ্যে ‘কোজাগরী’ আরও গুটি কয়েক নাটকের মতো একটি ‘সাবেকি, সনাতনী দুর্গা!’ যা শুধুই তৃপ্ত করে না, উৎসাহিত করে উদ্দীপিত করে, দাঁড় করায় এক চরম সত্যের সামনে। মনে করিয়ে দেয় – “অরাজনৈতিক থাকাটা একটা ক্যামোফ্লেজ”।

শুধু আমেরিকা নয় অনেক জায়গায় পঞ্চাশের দশকে ‘কমিউনিস্ট’ শব্দটা বেশ ভয়ের ছিল! ছিল আতঙ্কের! কিন্তু কাদের কাছে? ‘সাইলাস টিম্বারম্যান’ অনুসৃত ‘কোজাগরী’ সমসাময়িক বঙ্গিকরণে যথেষ্ট মুনশিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন নাট্যকার কৌশিক চট্টোপাধ্যায়। পঞ্চাশের দশকের সেই ‘কমিউনিস্ট’ শব্দটা আজ ভারতীয় প্রেক্ষাপটে ‘মাওবাদী’-তে রূপান্তরিত করেছেন এবং ‘এই মাওবাদী শব্দটাও’ একই রকম ভয়ের এবং আতঙ্কের! এবং সেই একই প্রশ্ন ‘কাদের কাছে??’একটা জায়গায় কৌশিক ওনার চরিত্রকে দিয়ে পরিষ্কার করে বলিয়েছেন যে, “আমি খুনের রাজনীতি সমর্থন করি না।” হ্যাঁ এটা বলার দরকার ছিল, না বললে পৈশাচিক লোলুপতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদীরা খামোকা মাওবাদী তকমা পেয়ে যেতেন। না বললে এটাও পরিষ্কার করে বলতে হোতো যে, অন্যায় অত্যাচার বঞ্চনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ প্রকৃত আন্দোলন মাওবাদীরা ছাড়াও অন্য কেউ কেউ করছে(!) ভারতবর্ষে। আবার এটাও পরিষ্কার করে বলতে হোতো যে, কমিউনিস্ট আন্দোলনে ‘খুন’ আর ‘আত্মরক্ষার জন্য হত্যা’ দুটো সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।

নাটক একটা দলগত উপস্থাপনা। সেই পরিপ্রেক্ষিতে দলগত অভিনয় এই নাটকের একটা সম্পদ, একটি বাড়তি পাওনা। যা সাম্প্রতিক কালের থিয়েটারে খুব বেশী চোখে পড়ে না। এক কথায় বললে – সব কলাকুশলীরা নিজের নিজের জায়গায় যথাযথ। পরিচালক কৌশিক চট্টোপাধ্যায় নাটকটির উপস্থাপনার আঙ্গিককে এমন ভাবে বুনেছেন যেখানে, আলাদা করে কোন অভিনেতা বা অভিনেত্রী বিশেষ ভাবে প্রশংসা পাওয়ার থেকেও নাটকের বিষয় অনেক বেশী প্রকট হয়ে উঠেছে। প্রকট হয়ে উঠেছে ব্রেখটিয়ান ঘরানার নাট্য উপস্থাপনা। পরতে পরতে প্রকট হয়ে উঠেছে সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে আমাদের রোজনামচায় আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়া ভীষণ চেনা, জানা, ভীষণ পরিচিত এক একটি অকৃত্রিম ছবি। যদিও প্রযোজনাটিতে কয়েকটি অসংগতি আমার মনে হয়েছে তবুও সেসব অনেকটাই ম্লান করে দিয়েছে নাটকটির বিষয়, নাটকটির উপস্থাপনা।

স্ত্রী, কন্যা নিয়ে আটপৌরে জীবন যাপনে অভ্যস্ত এক ‘কমন ম্যান’, এক গোবেচারা রবীন্দ্র অনুরাগী বাংলা সাহিত্যের অধ্যাপক অকস্মাৎ ‘স্বাক্ষর’ করে ফেলেন – তাদের কলেজের অতি প্রাচীন এক শাল বন কেটে ফেলার বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদ পত্র বা লিফলেটে। শুরু হয় নাটক। এক রাজনৈতিক দলের মদতপুষ্ট নেতা, ঠিকাদার, প্রশাসন, কলেজের অধ্যক্ষ, ছাত্র, ছাত্রমস্তান এদের সবার সব রকম রক্তচক্ষু, শাসানি, ষড়যন্ত্র, প্রলোভন, আক্রমণ, আঘাত উপেক্ষা করে সেই ‘কমন ম্যান’, সেই গোবেচারা অধ্যাপক হয়ে ওঠেন প্রতিবাদ, হয়ে ওঠেন আন্দোলনের নতুন মুখ। প্রতিবাদীর সাথে কথা বলতে চেয়ে রাতের অন্ধকারে তাকে থানায় ডেকে পাঠানো – এও এক চরম পরিচিত চিত্র। এর পর প্রতিবাদীর পরিণতি কি হবে জানতে বা বুঝতে বাকি থাকে না আর, এবং স্বাভাবিক নিয়মেই এটিই নাটকটির শেষ দৃশ্য হয়ে ওঠে। মনে একটা খটকা লাগে – এভাবে শেষ হবে নাটকটি! শাসকের ষড়যন্ত্রে এমন এক নির্লিপ্ত সমর্পণ! কোন প্রতিরোধ হবে না? পরক্ষণেই মনে হয় – না ঠিকই তো আছে, এও এক আন্দোলনের ধরণ। মনে হয় রাজ্যে অতো গারদ আছে তো? দেশে?

শুনেছি ‘হায়না’ নাকি হাসে না, আমার হাসি বলে যেটা জানি সেটা নাকি আসলে হায়না-র বিলাপিত কান্না। পাহাড় হাসছে, সমতল হাসছে, জঙ্গল হাসছে। হাসছে সমুদ্র, নদী-নালা, খাল-বিল। হাসছেন সাংস্কৃতিক কর্মীরাও আর হাসতে হাসতেই দেখে ফেলুন ‘কোজাগরী’। দেখতে বলুন আশে পাশের মানুষজনকেও। বড়ই ভয়ংকর একটা সময়ে আমরা সমস্ত আঁচ থেকে নিজেকে আলগোছে বাঁচিয়ে রাখার প্রয়াস করে চলেছি অবিরত। এভাবে বাঁচা যায় কি? নিজেদের সব ব্যর্থতা ঢাকতে একদল হতিয়ার করেছে সাম্প্রদায়িকতা একই কায়দায় নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে আর এক দল হাতিয়ার করেছে অসাম্প্রদায়িকতা! আসলে ভারতীয় সংসদীয় রাজনীতিতে অসাম্প্রদায়িক দল বলে কোন কালেই কিছু ছিল না, যেটা ছিল সেটাকে সাদা বাংলায় বলা যায় ছলনা। আর এই সব ছল চাতুরির গোলক ধাঁধায় গুলিয়ে দেওয়া হচ্ছে দৈনন্দিন সমস্যা, অরাজকতা, বঞ্চনা। আর ঠিক এই পরিস্থিতিতেই আদর্শ ভূমিকা পালনে অপরিহার্য হয়ে ওঠার কথা, প্রতিবিম্ব হয়ে ওঠার কথা, গর্জে ওঠার কথা ‘থিয়েটার-এর’। কিন্তু এক শ্রেণির থিয়েটার এই প্রতিবম্বকে ঝাপসা করে দেওয়ার খেলায় মেতেছে। মঞ্চ মায়ার ঐশ্বর্যে মুগ্ধ করে মাতিয়ে রাখতে চাইছে, দূরে সরিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে বঞ্চনার চরম বাস্তবিকতা থেকে। আর এক শ্রেণির থিয়েটার ঠিক সেই আদর্শ কাজটাই করছে যেটা থিয়েটারের করার কথা। যেটা থিয়েটারের কাছে কাঙ্ক্ষিত। ‘কোজাগরী’ ঠিক তেমনই একটি থিয়েটার। কোজাগরী – মরাগাঙে জোয়ারের আর এক নতুন নাম। কোজাগরীর মতো থিয়েটার আজ আরও বেশী করে হওয়া প্রয়োজন। কোজাগরীর আরও বেশী অভিনয় হওয়া প্রয়োজন। কোজাগরী আরও অনেক বেশী মানুষের দেখা প্রয়োজন।
ভালো প্রযোজনা। যারা দেখেন নি দেখে ফেলুন।

কোন বড় বিজ্ঞাপন ছাড়া এক বছরও বয়স না হওয়া দলটি তাঁদের পচিশ তম অভিনয় করে ফেললো গত ২৭-শে জুন মিনার্ভা থিয়েটার মঞ্চে। বেলঘরিয়া অভিমুখ-কে জানাই আন্তরিক অভিনন্দন। এই সময় যখন সমস্ত বিরুদ্ধ স্বরকে যেন তেন প্রকারেণ স্তব্ধ করে দেওয়াই একটা সংস্কৃতিতে পরিণত করে ফেলা হয়েছে ঠিক সেই সময় দাঁড়িয়ে একটা সদ্যজাত নাট্যদল ‘কোজাগরী’-র মতো নাটক মঞ্চস্থ করার স্পর্ধা দেখিয়েছে – শুভেচ্ছা জানাই বেলঘরিয়া অভিমুখ-কে। রইল ঐকান্তিক সমর্থন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *