মুখোমুখি খরাজ মুখোপাধ্যায়

শেয়ার করুন

সাক্ষাৎকার: পিয়াল ভট্টাচার্য, তমাল মুখোপাধ্যায় । অনুলিখন: পিয়াল ভট্টাচার্য


টেলিভিশন বা চলচ্চিত্রের পরিচিত নাম হলেও খরাজ মুখোপাধ্যায়ের অভিনয় শুরু থিয়েটারের হাত ধরেই। আজও তিনি মনে প্রাণে একজন আদ্যন্ত নাট্যকর্মী আর সেই থিয়েটারি তত্ত্বতালাশের হদিশ পেতেই তাঁর মুখোমুখি কলকাতা ক্যানভাস।

প্রথমেই একটা জিগ্যেস করব। অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ তৈরী হল কীভাবে?

অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ কিন্তু আমদের কম-বেশি সবার থাকে আর সেটার শুরু হয় স্কুল জীবনে। স্কুলে টিচারদের একটা নাম দেওয়া, তাঁকে নকল করা এই দিয়েই প্রায় সকলে অভিনয় শুরু করে।এইটাই কিন্তু প্রথম অভিনয়ের পাঠ। আমারও হয়তো এই মিমিক্রি করার ইচ্ছে, আনন্দ থেকেই তৈরী হয়েছিল অভিনয়ের আগ্রহ। আর, তাছাড়া আমার মামার বাড়িতে একটা সাংস্কৃতিক পরিবেশ ছিল। সেটার প্রভাব কোথাও পড়েছে আমাদের তিন ভাইয়ের মধ্যে। বড়দা খুব ভালো ছবি আঁকেন, ছোড়দা গান করেন। আর আমি টুকটাক অভিনয়….

আর থিয়েটারের সঙ্গে সম্পর্ক হল কীভাবে?

আমি পড়তাম সেন্ট লরেন্স স্কুলে। স্কুলের অ্যানুয়াল প্রোগ্রামে নাটক করতাম নিয়মিত। তারপর স্কুল শেষ, নাটকের পাঠও গেল চুকে। এদিকে তখন আমরা বড় হয়েছি, দুষ্টুমিগুলোও বেড়েছে যথেষ্ট। আমি থাকতাম ল্যান্সডাউন পদ্মপুকুরে।কিন্তু রোজ বিকেলে তখন আড্ডা দিতে, লুকিয়ে সিগারেট খেতে বন্ধুদের সঙ্গে যেতাম ম্যডাক্স স্কোয়ারে। এভাবে বেশ কিছুদিন যাবার পর একজন ভদ্রলোক, ওনার নাম সুকান্ত বসাক,একদিন হঠাৎ আমাদের সামনে আসেন। বলেন, হ্যাঁরে আমি রোজ বিকেলে এখানে ইভনিং ওয়াক করতে আসি। তোদের দেখি। সবাই এখানে ক্রিকেট খেলে, ফুটবল খেলে, আর তোরা কিছুই করিস না। শুধু আড্ডা দিস, লুকিয়ে সিগারেট খাস, টোনটিটকিরি করিস..। কেন রে?তো এটা শুনে আমরা বললাম আমাদের কেউ খেলতে নেয় না তাই। তখন উনি বললেন, তো নিজেরা চাঁদা করে ব্যাট বল কিনেও তোখেলতে পারিস। খেলতে যদি ভালো না লাগে, তো ক্রিয়েটিভ কিছু করতে পারিস। নাটক করতে পারিস এই নাটক করার আইডিয়াটা আমাদের বেশ মনে ধরলো। বললাম, করতে পারি, করাবে কে? তখন উনি ওনার বাড়িতে আমাদের পরের দিন ডাকলেন। গেলাম। একটা গল্প শোনালেন। আমাদের ভালোও লাগলো। তখন উনি নিজেই ওটার নাট্যরূপ দিলেন। ওনার বাড়িতেই চললো রিহার্সাল। বেশ কিছুদিন পর সেটার অভিনয় হল সুজাতা সদনে। আমাদের এক বন্ধুর বাবার প্রেস ছিল। সেখান থেকে কার্ড ছাপানো হল। তারপর উনি কিছু টাকা, আমরা কিছু টাকা দিয়ে হল ভাড়া করলাম। নিজেদের আত্মীয় স্বজন, বন্ধুবান্ধবদেরই কার্ড দিলাম।  তাতে প্রায় হাউসফুল শো হল। কিন্তু নাটকটা করার পর আমার কী একটা যেন হল! পরের দিনই সুকান্ত দা কে বললাম আমি আরও নাটক করতে চাই। তখন উনি জানালেন, অযান্ত্রিক নাটক সংস্থা তৈরী হচ্ছে, আমি সেখানে চাইলে যেতে পারি। সেই থেকে আজও আমি অযান্ত্রিক“-এরই একজন নাট্যকর্মী।

রমাপ্রসাদ বণিক – আপনার চোখে….

আমার গুরু, আমার সৃষ্টি কর্তা।

তাঁর সঙ্গে আলাপ, পরিচয়, তাঁর কাজ করার ধরন- সবটাই শুনতে চাই।

সে ভারী মজার গল্প। তখন আমি অযান্ত্রিকে নিয়মিত অভিনয় করি। পাশাপাশি, রঙ্গপীঠ, রঙ্গতীর্থ বা আরও অনেক দল অভিনয়ের জন্য আমায় ডাকে। সে সময় অযান্ত্রিকের প্রোডাকশন ‘ভূষন্ডীর মাঠে’ তে আমি ব্রহ্মদৈত্যের ভূমিকায় অভিনয় করি। নিয়মিত শুক্র, শনিবারের শো হাউসফুল। সময়টা ১৯৮২-৮৩ সাল। তখন মঞ্চে লোডশেডিং হলে জেনারেটর চালিয়ে আলো আসতে দেরি হত যথেষ্ট,এমনও হয়েছে, নাটকে আমি গান গাইছি, লোডশেডিং হয়ে গেছে। দর্শকরা বলছেন, দাদা আপনি গানটা চালিয়ে যান। আলো এলে বাকি নাটক আমরা বুঝে নেব।ফলে, আমার মনে হয়েছিল যে আমি একজন কেউকেটা অভিনেতা। সেই সময়ে আমার কলেজ সেন্ট জেভিয়ার্সের একশো পঁচিশ বছর উপলক্ষে ঠিক হয় একটা নাটক হবে। তাতে অভিনয় করবেন কলেজের শিক্ষক, প্রাক্তনী ও বর্তমান ছাত্রছাত্রীরা। সেই নাটকে নির্দেশনা দেবেন রমাপ্রসাদ বনিক। যারা যারা নাম দিয়েছিল, শুনলাম উনি নাকি সেখান থেকে অভিনেতা-অভিনেত্রী সিলেক্ট করবেন। আমি নাম দিইনি, কারণ তখন আমার বদ্ধ ধারনা যে আমি নিয়মিত মঞ্চে অভিনয় করা একজন ভালো, দক্ষ অভিনেতা। ফলে আমার নাম দেবার কোনো প্রশ্নই আসে না কলেজ থিয়েটারে।আমার তখন মনে হয়েছে, যারা নাম দিয়েছে তারা কেউ আমার লেভেলেই পড়েনা। আর কে একজন রামপ্রসাদ বণিক? উনি সিলেক্ট করবেন আমায় অভিনেতা হিসেবে! প্রায় এইরকম একটা অহংকার তখন চলছিল আমার মধ্যে। কলেজে গিয়ে শুনলাম ভিতরে নাকি সিলেকশন পর্ব চলছে। ভাবলাম, কী ফার্স হচ্ছে, যাই একবার দেখে আসি। গেলাম। গিয়ে দেখি, উনি একটা স্টোরি লাইন দিয়েছেন। সেটা হল একটা বাচ্চা ছেলের গলায় একটা দামি সোনার হার। একজন চোর সেটা চুরি করতে এসেছে। বাচ্চাটা ভাবছে এই চোর বোধহয় তার খেলার সঙ্গী। সে তার সঙ্গে খেলতে চায়, আর চোর সেই সুযোগে  চুরি করতে চায়। কিন্তু একই সঙ্গে তার মায়া হয় বাচ্চাটার ওপর। এটাই মাইম করে দেখাতে হবে। সবাই চোরের অভিনয় করছে। অডিশন শেষ হয়ে গেলে আমি বলি, আমি একবার করে দেখাবো?বাকিরা একটু আপত্তি করেন। কারণ আমি নামও দিই নি। তখন রমাপ্রসাদ বণিক বলেন, ‘ও কি অভিনয় করে দেখতে চায়? করুক’। আমি বাচ্চাটার অভিনয় করি। অভিনয় হল, উনি কিছুই বললেন না। ক’দিন পর সিলেকশনের যে লিস্ট বেরোলো তাতে দেখলাম আমার নাম আছে। শুনলাম, যে নাটকটা উনি করাবেন, সেটা দু’এক দিনের মধ্যেই উনি পড়বেন। নাটক পড়ার দিনও এলো। সেদিন সবাই স্টেজের ওপর বসে ওনার অপেক্ষা করছে,আর স্টেজে একটা চেয়ার রাখা।আমি গিয়ে ফাঁকা চেয়ার দেখে সেখানেই বসলাম। উনি ঢুকেই প্রথমে আমার দিকে তাকালেন, বললেন ‘তোমার পায়ে কী ব্যথা বা কোনোরকম সমস্যা আছে?’। আমি একটু ঘাবড়ে গিয়ে বললাম, না। ওনার সঙ্গে সঙ্গে পাল্টা প্রশ্ন ‘তাহলে সবাই মাটিতে বসে, তুমি চেয়ারে কেন বসে, আগে মাটিতে বোসো’। আমার ইগোতে বিশাল লাগলো। ততদিনে আমার এই বোধটা তৈরী হয়ে গেছে যে আমায় অস্বীকার করার ক্ষমতা কারুর নেই। আমি ওনার এই কথা শুনে বেশ একটা দেখে নেবার মানসিকতা নিয়ে শুনতে বসলাম  নাটকটা। উনি স্ক্রিপ্ট পড়তে আরাম্ভ করলেন। তারপর যত উনি নাটকটা পড়ছেন, তত আমি শুনছি আর ভাবছিযদি  পড়াটাই এই মাপের হয়, তাহলে অভিনয় বা নির্দেশনাটা কোন মাপের হবে! আর প্রতি মুহূর্তে বুঝছি, আমি এতদিন ধরে যে অভিনয়টা করেছি সেটা একটা বিগ জিরো, অর্থহীন। থিয়েটার, অভিনয় কী..আমি এখনো তার কিছু জানি না। আমার ওই প্রাচীরের মতো অহংকার ভেঙে গুঁড়িয়ে গেল একমুহূর্তে। নাটকপড়া শেষ করে,রিহার্সালের ডেট দিয়ে উনি বাড়ি যাচ্ছেন, আর আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো ওনার পিছন পিছন যাচ্ছি। অনেকক্ষণ  লক্ষ্য করার পর উনি ডেকে বললেন, ‘কিছু বলবি তুই আমায়?’ আমি বললাম, আমি আপনার সঙ্গে থাকবো, আমি শিখবো,আমায় শেখাবেন।উনি প্রথম দিন ঠিক আছে বলে, হবে তো..এইরকম সান্ত্বনা দিয়ে কোনোরকমে আমায় ক্ষান্ত করলেন।কিন্তু আমি বাড়ি ফিরে ঘুমোতে পারলাম না। কলেজের নাটকের রিহার্সাল শুরু হল, আমি মুগ্ধ হয়ে ওনাকে দেখতে লাগলাম আর অভিনয় বলতে ঠিক কী বোঝায়, রোজ একটু একটু করে শিখতে লাগলাম। এমন সময় আরেকটা ঘটনা ঘটলো। তরুণ মজুমদারের ‘ভালোবাসা ভালোবাসা’ সিনেমায় আমার অভিনয়ের সুযোগ এসে গেল। এদিকে তখনো নাটকটা নামে নি। আমি কী করবো ভেবে না পেয়ে রমাদা’কে বললাম। রমাদা কিছুই বললেন না। শুধু বললেন, ‘তোর ব্যাপার। তোর যেটা ভালো মনে হয়, যেটা তুই ঠিক মনে করবি, সেটাই করবি’। আমি সিনেমার অফারটা ছেড়ে দিলাম। নাটকটা হল আর সেই নাটকের পর আমি রমাদা’কে বললাম, দাদা আমি বুঝে গেছি, আমার আর কিছু হবে না। আমি আপনার সঙ্গে থাকতে চাই, আপনার দলে। রমাদা আমায় ভালো করে আবার ভাবতে বললেন। আমার তখন ভাবার আর কিছু নেই। আমি তখন সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছি। যোগ দিলাম রমা দা’র দলে। তখন ‘চেনামুখ’এ গিয়ে দিনের পর দিন বসে থেকেছি। দাদা ডিরেকশন দিচ্ছেন। আমি দেখছি, শিখছি। ‘রানী কাহিনী’, ‘আগশুদ্ধি’ নামছে – ব্যাক স্টেজ সামলাচ্ছি। অবশেষে যখন ‘পাখি’ নাটকটা নামার প্রস্তুতি চলছে, যখন আমি একটা চরিত্র যখন পেলাম অভিনয়ের জন্য, ঠিক তখনই আমার চাকরি হয়ে গেল রেলে। চাকরিটা পেয়ে ছুটে গেলাম রমাদা’র কাছে। বললাম দাদা কী করবো? এদিকে, বাবা খুব চাপ দিচ্ছেন চাকরির জন্য। কারণ, আমার বাবা, বিশ্বাসই করতেন না যে এই অভিনয় যে কারুর পেশা হতে পারে। আমি পড়লাম দ্বিধায়। কী করবো? অভিনয় নাকি চাকরি? তখন রমাদা আমায় বললেন, ‘যা তুই চাকরিটা করতে যা। তবে, বেশিদিন তুই চাকরিটা করতে পারবি না। তোকে চাকরি ছাড়তেই হবে। তুই অভিনয়টাই ভবিষ্যতে করবি। সে থিয়েটারে হোক বা সিনেমায়’। ওনার সেদিনের কথাটা কতখানি সত্যি, সেটা আজ বুঝতে পারি।

একটু অন্য কথা জিগ্যেস করি, এখনো আপনি মঞ্চে অভিনয় করেন, ধরা যাক, ‘অযান্ত্রিক’-এর ‘প্রথম পাঠ’ নাটক।এই নাটকটা যাঁরা দেখতে আসছেন, তাঁদের মধ্যে অনেকেই কিন্তু নাটকটা দেখতে আসছেন না বরং দেখতে আসছেন খরাজ মুখোপাধ্যায়কে। এইটা কেমন লাগে?

দুঃখের, খুবই দুঃখের। খুব খারাপ লাগে। এই বিষয়ে একটা গল্প তোমাদের বলি। একটি দল কল শো-এর জন্য ‘ভূষন্ডীর মাঠে’ নাটকটা বুক করেন। যখন শো-টা হবার কথা, সেই সময় কোনো একটা কারণে আমার কলকাতার বাইরে থাকার কথা। ফলে, শো টা করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমার জায়গায় অন্য একজন অভিনয় করবেন, এটাই স্বাভাবিক। এটা শুনে সেই সংস্থা বিশাল ঝামেলা করা শুরু করে দেয়। আমায় ফোন করা হয় সেই দল থেকে। তখন আমি ওনাদের বলি, আপনারা অযান্ত্রিক নাট্য সংস্থার ‘ভূষন্ডীর মাঠে’ নাটকটা বুক করেছেন, খরাজ মুখোপাধ্যায়কে কিন্তু বুক করেন নি। কিংবা আমাদের এই রকমও নিয়ম নেই যে খরাজ মুখোপাধ্যায় সহ প্রোডাকশন কিংবা খরাজ মখোপাধ্যায় ছাড়া প্রোডাশন। একটু কড়া ভাবেই বলি, খরাজ মুখোপাধ্যায় যদি গানের অনুষ্ঠান করতে এক লাখ টাকা নেন, এই নাটকে অভিনয় করার জন্য কিন্তু পাঁচ পয়সাও নেন না, আপনারা আগে নাটক দেখা মানসিকতা তৈরী করুন।

কিন্তু এ দেখা যায়, ইদানীং দর্শকের একটা বড় অংশ নাটক দেখার ক্ষেত্রে একটু চেনা নামের দিকে বেশি ঝুঁকছেন। ধরুন, আমি নিজে দেখেছি অ্যাকাডেমি কাউন্টারে গিয়ে একজন কে বলতে, আচ্ছা এই নাটকে কি অমুক অভিনেতা আছেন? তাহলে উনি দেখবেন সেটা। দর্শকদের কি নাটক দেখার রুচি বদলে গেছে? কী মনে হয়….

এইটার উত্তর একটু অন্যভাবে দিই। আমরা কলেজ লাইফে তো তেমন বাড়ি থেকে হাত খরচ পেতাম না, তাই আমরা বন্ধুরা মিলে তখন একটা গানের দল তৈরী করি। নাম দিই ‘ডানা’। টুকটাক পাড়ায় জলসা করে পকেট মানি তুলতাম। সেখানে আমি গান গাইতাম, প্রতীক (প্রতীক চৌধুরী) গাইতো, শ্রীকান্ত (শ্রীকান্ত আচার্য) হারমোনিয়াম বাজাতো, বিক্রম (বিক্রম ঘোষ) তবলা বাজাতো, কখনো সঞ্জয় (সঞ্জয় চৌধুরি) কী-বোর্ড বাজিয়ে দিত । আমরা বন্ধুরা কেউ কখনো ভাবিনি যে মিউজিক আমাদের কেরিয়ার হতে পারে। তারপর যখন দেখলাম ওরা সবাই মিউজিককে প্রফেশন করলো, সবার অ্যালবাম বেরোলো-তখন আমার স্ত্রী আমাকে এমনি একদিন বললেন একটা গানের অ্যালবাম করতে। আমার কেমন একটা ইচ্ছেও চেপে গেল। কিন্তু অ্যালবামটা করে দেখলাম আমার গান শোনার লোকের চেয়ে আমার গান শোনানোর লোকের সংখ্যা বেশি। থিয়েটারেও এই একই খেলা চলছে। এত দল, এত নাটক-ডিম্যান্ডের চেয়ে সাপ্লাই বেশি হয়ে যাচ্ছে। ফলে, দর্শকদের একটা বড় অংশ ভালো নাটক খারাপ নাটকের তফাৎ বুঝতে না পেরে আর্টিস্টের দিকে ঝুঁকে পড়ছেন। তাঁরা ভাবছেন, এই নাটকে ওমুক আর্টিস্ট আছেন, তাহলে ওটাই দেখবো। এটাই যদি এখন গ্রুপ থিয়েটারের ট্রেন্ড হয়ে যায়, তাহলে বোর্ড থিয়েটারকে দোষ দিয়ে লাভ কী!

দীর্ঘদিন পর ‘পড়ে পাওয়া ষোলো আনা’ নাটকে আপনি নাটককার, নির্দেশক ও অভিনেতাতিনটি ভূমিকাতেই মঞ্চে ফিরলেন– হঠাৎ এইভাবে আবার থিয়েটারে আসার কারণ কী?

মঞ্চে এর আগে আমার শেষ কাজ ছিল অযান্ত্রিক দলের হয়ে ‘প্রথম পাঠ’। তাতে অবশ্য শুধু অভিনয়টাই করতাম। সে নাটকের লেখক ও নির্দেশক ছিলেন রমাপ্রসাদ বণিক। তারপর ওই দলের জন্য আরেকটা নাটক লিখতে শুরু করেছিলেন উনি, কিন্তু তা শেষ করার আগেই  চলে গেলেন। ফলে, একটা বিরাট শূন্যতা  নেমে এল। এদিকে, তখন আমার দলের অবস্থাও ভালো নয়। আর্থিকভাবেও খুব ভালো জায়গাতেও ছিলনা। আমার সে সময় মনে হল দলের কিছু কল শো প্রয়োজন। যাতে দলের আর্থিক অবস্থাটা একটু ভালো হয়।এদিকে আমি ছবি করবো বলে কিছু গল্প মনে মনে সাজিয়ে রেখে ছিলাম। প্রযোজকও খুঁজছিলাম। তার থেকে একটি গল্পকে আমি নির্বাচন করে নাটকটা লিখে ফেলি দলের জন্য। যে নাটকের মূল বিষয়টাই হল এন্টারটেইনমেন্ট। হাসি, মজার আড়ালে কিছু সোশ্যাল মেসেজ দেওয়ার চেষ্টা।যেখানে কীর্তন, হোলি, আইটেম নাম্বার- সব আছে। কিন্তু আমার দলে নাটকটা করতে গিয়ে দেখলাম এটা করার জন্য যে স্ট্রেন্থ প্রয়োজন, সেটা লোক বল হোক কিংবা আর্থিক- তা তখন ছিল না  আমাদের।ফলে, করা হল না নাটকটা। অনেকদিন পর, বেহালা ব্রাত্যজনে আমি  একটা ওয়ার্কশপ করাতে গেছিলাম। সেখান থেকেই কথায় কথায় একদিন সুপ্রিয়কে (সুপ্রিয় চক্রবর্তী) বললাম আমার নাটকটার কথা। সুপ্রিয় শুনতে চাইল স্ক্রিপ্টটা। একদিন বাড়িতে বসে শোনালামও ওকে। তারপর স্ক্রিপ্ট শুনেই সুপ্রিয় বললো ‘বেহালা ব্রাত্যজন’ এই নাটকটা করতে চায় ওদের আগামি প্রযোজনা হিসেবে। কিন্তু ওদের একটা শর্ত আছে। শর্ত এটাই, যে এই নাটকটা  আমায় ডিরেক্ট করতে হবে এবং এতে অভিনয়ও করতে হবে। সেখান থেকেই ‘পড়ে পাওয়া ষোলো আনা’য় আমিই নাটককার আমিই নির্দেশক এবং একজন অভিনেতা।

এক কথায় জানতে চাইছি এই মুহূর্তে থিয়েটারে বানিজ্যিকরণের প্রয়োজন কতটা?

ভীষণ প্রয়োজন। ভীষণ রকম দরকার এটা। ব্যবসার কথা মাথায় রেখেই আমার ‘পড়ে পাওয়া ষোলো আনা’ করা।

এখন একটা জিনিস ভীষণ লক্ষ্য করা যায়, তরুণ প্রন্মের অনেকেই থিয়েটারে আসছেন শুধু অভিনেতা বা অভিনেত্রী হতে, বা একটু অন্যভাবে যদি বলি, তারা আসছেন কেবল অভিনয়ের জন্য। থিয়েটারের বাকি বিষয়গুলোর প্রতি তাদের কোনো আগ্রহ বা উৎসাহ নেই। এটাকে কীভাবে দেখেন?

এই সমস্যাটা দুটো দিক দিয়ে বলবো। প্রথমত, একজন ছেলে বা মেয়ে থিয়েটারে এসেই এখন বলতে থাকে সে থিয়েটারের একজন বা থিয়েটার ইন্ডাস্ট্রির একজন। কী করে সেটা সম্ভব? সে তো কিছু জানলোই না, চিনলোই না, শিখলোই না। আমি চোদ্দ বছরের বেশি ফিল্মে কাজ করছি। এখন আমি বলতে পারি আমি ইন্ডাস্ট্রির পার্ট বা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির একজন লোক। এই সময়টাই এখন অনেকে দিতে চায় না। আমি চোদ্দ বছর রমাপ্রসাদ বণিকের সঙ্গে কাজ করেছি। প্রথম ছ’বছর কী করেছি? শুধু দলের ঘরে গিয়ে বসেছি।প্রথম ছ বছর কী করেছি?? রির্হাসাল রুম ঝাঁট দিয়েছি। রিক্যুইজিশন গুছিয়েছি। ওনারা অভিনয় করেছেন, দেখেছি। এই ছ’বছর দেখেছি বলে তবে না কিছু শিখতে পেরেছি। রমাদা রির্হাসালের সময় বারবার বলতেন, ‘আমি চাইনা মঞ্চে সাত কী আটটা রমাপ্রসাদ বণিক অভিনয় করুক। আমি যেভাবে ডায়লগ ডেলিভারি করছি, তোমরা সেভাবে না করে নিজেদের মতো করে করো।ভাবো’। এই সময়টা দিলে এই শেখাটা হলে তবে তো সে অভিনয় করতে পারবে। তা না হলে অভিনেতা হতে চেয়ে থিয়েটারে এসেই বা কী লাভ! দ্বিতীয়ত, এখন যারা অভিনয় করে তারা কি সবাই জানে শো শেষ হয়ে গেলে জিনিসপত্র কে গোছায়? আমাদের সময় আমরাই সেট লাগাচ্ছি, সেট খুলছি, ম্যাটাডোরে সেট তুলছি, গোডাউনে মাল নামাচ্ছি, হলের কাউন্টারে বসছি। এভাবেই তো ধীরে ধীরে থিয়েটারের পুরো প্রসেসটাকে বুঝেছি। এখন সব দলে এইরকম হয়? তুমি সবকিছু আলাদা লোক দিয়ে করাবে, তাহলে কীভাবে তুমি আশা করতে পারো,যে আজও থিয়েটারে এসে ছেলে মেয়েরা পুরো প্রসেসটা বুঝবে? তাই, তারা জানে থিয়েটার মানে শুধু অভিনয়,তারা সেটাই করতে আসে। ওই মেসবাড়িতে থাকার মতন, নিজের বাড়ি সেটা হয়ে ওঠেনা কোনোদিন।

এবার একটু র‍্যাপিড ফায়ারে যাই।

আপনার দেখা তিনটি প্রিয় নাটক….

প্রথম নীলকন্ঠ। দ্বিতীয় নাটকটা আমি কোনোদিন দর্শকাসনে বসে দেখি নি। কারণ, আমি তাতে অভিনয় করতাম। সেটা হল দ্য টেমপেস্ট। আর তৃতীয়, একলা চলো রে। তৃতীয় নাটকটা নিয়ে একটু বলি, আসলে উৎপল দত্তের এই নাটকটা আমায় ভীষণ ছুঁয়ে গেছিল। এর আগে উৎপল দত্তের বহু নাটক আমি দেখলেও সেগুলোকে উপলব্ধি করার মতো বয়স আর মন দুটোই আমার তখন ছিল না।

তিনজন প্রিয় পরিচালক….

রমাপ্রসাদ বণিক, উৎপল দত্ত, অজিতেশ বন্দোপাধ্যায়।

এইসময় কোন কোন অভিনেতাদের কাজ আপনাকে মুগ্ধ করে?

প্রথমেই বলবো দেবশঙ্কর হালদার। মঞ্চে ওর সাথে কাজ না করলেও ছবিতে ওর সঙ্গে অভিনয় করেছি। আমি তো ওকে বলি, কী করে তুমি নাটকের এত সংলাপ মনে রাখো? আমি হলে তো এ নাটকের পাঠ অন্য নাটকে বলে দিতাম। দেবু হেসে বলে, ‘তুমি কী একটা গান গাওয়ার সময় অন্য গানের লাইন গেয়ে দাও? তুমি তো এত গান মনে রেখেছো। আমিও ওভাবেই মনে রাখি। দ্বিতীয় নাম বলবো, রজতাভ দত্ত। ওর মতো ভার্সেটাইল অভিনেতা থিয়েটারে খুব কম আছে। এছাড়া নীল, কাঞ্চন- কার বলবো, কাকেই বা বাদ দেবো!একসময় চন্দন সেনের মঞ্চে অভিনয় মুগ্ধ হয়ে দেখেছি, শান্তিলালের কত অসাধারণ কাজ আছে থিয়েটারে…. বলা খুব মুশকিল।

আর অভিনেত্রীদের কথা জিগ্যেস করি…..

এখন হয়তো আর অভিনয় করেন না, কিন্তু শাঁওলী মিত্রের অভিনয়….. আহা….। সুদীপ্তা চক্রর্বতী,কী দারুণ কাজ করেছে থিয়েটারে। এবং বিদীপ্তা চক্রর্বতী। ও যে কেন আরও বেশি করে থিয়েটারে অভিনয় করে না…..!

ন কোনচরিত্র, যাতে অভিনয় করার ইচ্ছে আপনার ভীষণ।

সব চরিত্র, মানে ভালো কোনো নাটক দেখলে, শুনলে মনে হয় এটা যদি আমি করতে পারতাম। ‘নীলকন্ঠে’ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় যে চরিত্রটায় অভিনয় করেছেন, ‘মুষ্ঠিযোগ’- এ দ্বিজেন বন্দোপাধ্যায় যে চরিত্রে অভিনয় করেছেন- দেখতে দেখতেই ভবতাম,যদি এটা আমি অভিনয় করতে পারতাম। জানি, ওনাদের লেভেলে অভিনয় করতেএ কটুও পারতাম না, কিন্তু ওই…. ইচ্ছে তো হয়….।(হাসি)

এমন কোনো চরিত্র, যেটা করতে না পারার জন্য এখনো আফসোস হয়….

বাক। রমাপ্রসাদ বণিক নির্দেশিত ‘চৈতালী রাতের স্বপ্ন’ নাটকের ‘বাক’ চরিত্রটায় অভিনয় করতে না পারার আফসোস আমার থেকেই গেল।

থিয়েটারে আপনার কোনো ড্রিম প্রোজেক্ট আছে?

আমার একটা মুশকিল হচ্ছে আমি এই ড্রিম প্রোজেক্ট বিষয়টা নিয়ে ভাবতেই চাই না। খালি মনে হয়, যদি কোনো একটা নাটককে যদি ড্রিম প্রোজেক্ট ভাবি, তাহলে সেটা করে ফেললে কী হবে? আর কী স্বপ্ন দেখবো না? আর কোনো কাজ কী স্বপ্নের কাজ হবে না? ওই জন্য যখন যেটা করি, সেটাকেই ভাবি ড্রিম প্রোজেক্ট। এতদিন ‘পড়ে পাওয়া ষোলো আনা’ ড্রিম ছিল, হয়ে গেছে। পরের নাটকটার জন্য এখন স্বপ্ন দেখছি।

শেষ প্রশ্ন, আগামি দিনে থিয়েটারে কোন কাজটার সঙ্গে জড়িয়ে থাকতে চান।

অভিনয়। আরও অনেক রকমের, অনেক ধরনের, চরিত্রে অভিনয় করতে চাই। বারবার মঞ্চে নানা রকমভাবে ফিরতে চাই। থিয়েটারে অভিনেতার একটা বিরাট সুবিধে আছে। এটা নিজেকে প্রতিদিন তৈরী করার জায়গা। এইটা সিনেমা নয়, দর্শকের ফিডব্যাক সরাসরি পাওয়া যায়। আর এমন নয় যে একবার টেক হয়ে গেলে, ব্যস যা করলে তা ফাইনাল চিরকালের জন্য। দর্শক আমার অভিনয় দেখে বলবেন আজ আপনি ভালো করেছেন, আজ অসাধারণ করলেন, আজ কিন্তু কিস্যু হয়নি – তখনই তো আমি বুঝবো আমার অভিনয়ের প্লাস পয়েন্ট, আমার অভিনয়ের খামতি। ‘বেহালা ব্রাত্যজন’-এ সুপ্রিয় আমায় বলেছে বলেই থিয়েটারে ডিরেকশন দিয়েছি। আমি মনে প্রাণে বিশ্বাস করি, থিয়েটার ডিরেকটরস্ মিডিয়াম নয়, সেটা একান্তভাবে অভিনেতাদের জায়গা। থার্ডবেল পড়ে গেলে ডিরেক্টরের আর কোনো ভূমিকা নেই। স্টেজের ওপর যারা পারর্ফম করবে পুরোটাই তখন তাদের দায়িত্ব। আর সেই জায়গা থেকেই অভিনয়ের জন্য আগামিদিনে বারবার ফিরে আসতে চাই মঞ্চে।

শেয়ার করুন