দুই-এক্কে-দুই: মুখোমুখি অনির্বান চক্রবর্তী ও সুদিপা বসু

শেয়ার করুন

সাক্ষাৎকার: তমাল মুখোপাধ্যায় । অনুলিখন: শ্রীনি মিত্র


সুদিপা বসুর চোখে অনির্বান চক্রবর্তী

এই সময় থিয়েটারের তরুণ প্রজন্মের অভিনেতা-অভিনেত্রীদের নিয়ে লিখতে গেলে অনেকের কথাই বলতে হয়। কোনও একজনকে ওইভাবে বেছে নেওয়াটা বেশ সমস্যারই। তবু আমার ওপর এই কঠিন দায়িত্বটা অর্পণ করলো কলকাতা ক্যানভাস। কথায় কথায় অনেকের নাম উঠে এলেও অনির্বাণের নামটা আসতেই আমি রাজি হয়ে গেলাম প্রস্তাবটায়। কারণ, কোথাও অনির্বাণ আমার বেশ কিছুটা পরিচিত। সে ব্যক্তিগত জায়গায় হোক বা কাজের জায়গায়। অনির্বাণ, মানে অনির্বাণ চক্রবর্তী। ওকে আমি প্রথম দেখি ‘চলচিত্ত চঞ্চরি’ নাটকে। প্রথম দিনের সেই অনবদ্য পারফর্মেন্স আমায় মুগ্ধ করে, আর তারপর থেকেই শুরু আমাদের বন্ধুত্ব। তবে এই পরিচয় আরও বেশি চেনা-জানায় বদলালো, যখন অনির্বাণ আমার সঙ্গে কাজ করলো ‘জলজ্যান্ত’তে। অনির্বাণকে নিয়ে কাজ করতে গিয়ে প্রথম যেটা আমায় মোহিত করে, সেটা ওর মূল্যবোধ। অরুণ মুখোপাধ্যায়ের মতো মানুষের সান্নিধ্যে থাকার জন্য বেশ কিছু গুণ ওকে একজন সম্পূর্ণ অভিনেতা হতে ভীষণরকম সাহায্য করেছে। ওর সময়ানুবর্তিতা, সহ অভিনেতাদের প্রতি দায়বদ্ধতা, নিজের কাজের প্রতি অসম্ভব মনোযোগ অনির্বাণকে কোথাও অনির্বাণ হতে সাহায্য করেছে। আর অভিনেতা অনির্বাণ চক্রবর্তীর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য  হল, নিজের ইগোকে অস্বীকার এবং নস্যাৎ করা। ঔদ্ধত্য আর অহংকারের মধ্যে যে ব্যবধান রয়েছে অনেক অভিনেতাই সেই সূক্ষ্ম তফাৎ সম্পর্কে অবগত নন। কিন্তু এই অভিনেতা ভীষণভাবেই সচেতন এ দুইয়ের পার্থক্যগত দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়ে। আর সেই দৃষ্টিভঙ্গিগত আধুনিকতাতেই অনির্বাণ চক্রবর্তী খুব সহজে, খুব অল্প সময়ে হয়ে উঠেছেন পরিচিত অভিনেতা অনির্বাণ চক্রবর্তী।

প্রতিটা ক্ষেত্রে অনির্বাণের মৌলিক অভিনয়টা ধরা পড়েছে ভীষণভাবে।

আমি যতদূর জানি, ওর অভিনয় জীবনে আসাটা বেশ খানিকটা দেরিতে, কারণ ও আগে অধ্যাপনা করত। তবে ওর অভিনয় জীবনের যাত্রাপথটার দিকে যদি একবার ফিরে দেখি, তাহলে দেখব এই স্বল্প সময়ে ও যেমন অনেক বড় বড় কাজে নিজেকে মেলে ধরেছে, তেমনি অনায়াসে কাজ করেছে ছোট বা কম পরিচিত প্রোডাকশনে। তবে প্রতিটা ক্ষেত্রে অনির্বাণের মৌলিক অভিনয়টা ধরা পড়েছে ভীষণভাবে। আর সেই অভিনয় ক্ষমতাতেই ‘গোপাল অতি সুবোধ বালক’এর মতো একাঙ্ক নাটকও দর্শকদের মন কাড়তে সক্ষম হয়েছে। আবার ‘ফেরা’ বা ‘ঘটক বিদায়’এর মতো মাল্টিকাস্টিং নাটকেও অনির্বাণ কিন্তু নিজের অভিনয়ের স্বাক্ষর রাখতে পেরেছে অনায়াসেই। তবু আমার কাছে অনির্বাণ চক্রবর্তী বললেই স্মৃতির মধ্যে যে কটা নাটক এক নিমেষে ছায়া ফেলে সেগুলো হল ‘চলচিত্ত চঞ্চরি’, ‘রজত জয়ন্তী’, ‘কাচের পুতুল’ বা ‘আর্ট’। ‘আর্ট’ এর মধ্যে যে কঠিন চরিত্রে আমরা ওকে পেয়েছি, তা ব্যক্তি অনির্বাণের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা, আবার ‘কাচের পুতুল’এ সেই অনির্বাণই একটা সাদামাটা আটপৌরে ছেলের অভিনয়ে নিজেকে মেলে ধরছে চূড়ান্তভাবে। যে অভিনয় দেখে একজন দর্শক কোথাও নিজের স্বপ্নকে খুঁজে পান ওই চরিত্রটির ভিতর। পাশাপাশি ‘চলচিত্ত চঞ্চরি’তে একটা হাস্যরসাত্মক চরিত্রে অনির্বাণের অভিনয় দেখে দর্শকের চোখে এবং মনে কেমন একটা শান্তির ছায়া নেমে আসে। কোথাও বাড়তি কিছু মনে হয় না। মনে হয় না এই কমিক অ্যাক্টিংটি বড় বেশি উদ্ভট। অভিনয়ের এই স্বাভাবিকতা বজায় রাখাই অভিনেতা অনির্বাণের সবচেয়ে বড় গুণ। ব্যক্তিগত পরিচয় থাকার কারণে  আরেকটু বলতেই পারি, যে কাজ ওর ভালো লাগে না, ও সেখান থেকে খুব সহজে বেরিয়ে আসতে পারে। মনের মধ্যে একরাশ বিরক্তি রেখে অভিনয় করতে আমি অনির্বাণ চক্রবর্তীকে এখনও দেখিনি।

আমি বারবার চাইবো অনির্বাণকে সেই চরিত্রগুলোর মধ্যে দেখতে, যে ধরণের চরিত্রে ও এখনও অভিনয় করেনি।

অভিনেতা অনির্বাণ চক্রবর্তীর সঙ্গে নির্দেশক হিসেবে আমার একমাত্র কাজ ‘জলজ্যান্ত’। তাই নির্দেশক হিসেবে অনির্বাণের অভিনয় ক্ষমতাকে আগামি দিনে আরও বেশি কাজে লাগানোর ইচ্ছা আমার ভীষণই। নাট্য নির্মাণের দিক থেকেই হোক বা একজন দর্শকের জায়গা থেকেই হোক, আমি বারবার চাইবো অনির্বাণকে সেই চরিত্রগুলোর মধ্যে দেখতে, যে ধরণের চরিত্রে ও এখনও অভিনয় করেনি। বলতে পারি, একজন অসম্ভব খারাপ লোক, ভিলেনের চরিত্র বা বলা যায়  কোনোরকম ডার্ক ক্যারেকটারে অভিনয়ের ক্ষেত্রে এখনও ব্যবহারই করা হয়নি অনির্বাণ চক্রবর্তীর অভিনয় দক্ষতা।দেখা যাক,তেমন নাটক পেলে হয়তো আমি ওকেই নির্বাচন করবো নেগেটিভ চরিত্রে অভিনয়ের জন্য।

আরও একটা বিষয় আমার খুব ভালোলাগে, যখন দেখি মঞ্চের বাইরেও সাধারণ দর্শকের কাছে অনির্বাণ বিখ্যাত হন ‘একেন বাবু’ হিসেবে। মঞ্চে না হলেও ওর অভিনয় ক্ষমতাটা যে এইভাবে অসংখ্য দর্শকের কাছে পৌঁছাচ্ছে, অনির্বাণের কাছের বন্ধু হিসেবে এটা আমায় আনন্দ দেয় ভীষণ। তবে একটা কথা এই সঙ্গেই বলবো, একেন বাবুর দর্শকদের মঞ্চ পর্যন্ত নিয়ে আসার দায়িত্বটাও ভাগ করে নিতে হবে আমাদেরকেই।

আসলে অভিনেতা অনির্বাণ চক্রবর্তীর কাছ থেকে আজকের প্রজন্মের থিয়েটার কর্মীদের অনেক কিছু শেখার আছে। ওর নিয়মানুবর্তিতা এবং নিজের কাজের প্রতি ও দলের অন্যান্যদের প্রতি চূড়ান্ত দায়বদ্ধতা- সত্যিই শেখার মতো। একজন পরিচালককে শ্রদ্ধা করেও একটা সংগত প্রশ্ন রাখার মন, নিজের কাজের পাশাপাশি দলের জন্য নিজেকে তৈরি করার  প্রয়াস  অনির্বাণ চক্রবর্তীর অভিনেতা ও ব্যক্তিসত্তার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এমনকী,ওর কাজ শেখানোরও একটা নির্দিষ্ট পন্থা আছে, সেটা হল- একটা উদাহরণ দিয়ে ছেড়ে দেওয়া। যাদের বুদ্ধি ও মেধা আছে, তারা সেখান থেকেই শিখে যাবে,বুঝে নেবে অনেককিছু। আসলে অনির্বাণ খুব সিরিয়াস, নির্ভরশীল এবং খুব ভালো বন্ধু। তাই কেউ যদি সত্যিই তার বন্ধু হয়, আমি খুব নিশ্চিতভাবে বলতে পারি যে কোন বিষয়েই সে খুব সুচিন্তিত, বাস্তবসম্মত মতামত ও পরামর্শ পাবে ওর কাছ থেকে। অভিনেতা অনির্বাণ চক্রবর্তীর পাশাপাশি ব্যক্তি অনির্বাণ চক্রবর্তীর প্রতি আমার ভালোলাগাটা এখানেই।

অনির্বাণ চক্রবর্তীর চোখে সুদীপা বসু

আমি কলকাতা শহরের ছেলে নই,বজবজের মহেশতলায় আমার বেড়ে ওঠা।শহরতলীর আনাচে কানাচেই জীবনের অনেকটা সময় কেটেছে,তাই সেভাবে নিয়মিত থিয়েটার দেখার সুযোগ বা অভ্যাস কোনওটাই আমার খুব বেশি হয়ে ওঠেনি। একটা সময়ের পর আর পাঁচজন মানুষের মতো জীবিকা নির্বাহ করার জন্য আমি চাকরি করতাম, অধ্যাপনার।তবে, তার সঙ্গেই খুব প্যাশনেটলি থিয়েটারটাও করতাম,।কিন্তু সেটা ছিল আমার নেশার থিয়েটার, পেশার নয়। এমনকী,সেই সময় থেকে নিয়মিত থিয়েটার দেখাটা আমার প্রায় যাপনেরই একটা অংশ হয়ে উঠেছিল।তখনই আমি বেশ কিছু কাজ দেখেছি সুদীপা বসুর।মনে পড়ে,প্রথম দেখেছিলাম ‘বাসভূমি’। তারপর ‘কর্ণাবতী’,তারপর একে একে আরও। আমার কাছে তখনও কিন্তু উনি সুদীপা বসু’ই ছিলেন,কেবল একজন অভিনেত্রী,একটা পরিচিত নাম,ব্যস এইটুকুই।দর্শক আসনে বসে ওনার অভিনয় দেখতে দেখতে সেই মুহূর্তগুলোতে আবার খালি মনে হতো,এটা উনি কি করছেন! এইরকম অভিনয়ও মঞ্চে ফুটিয়ে তোলা যায়! তারপর সময় বয়েছে অনেক,আর উনিও সুদীপা বসু থেকে আমার কাছে সুদীপা দি হয়েছেন। তাই এখন আমি খুব সহজে মেলাতে পারি,আমি যে ধরনের অভিনয় বা যে ঘরানার অভিনয় পছন্দ করি, যে ধাঁচ বা স্টাইলের অভিনয় করার চেষ্টা করি, যে অভিনয় ধারার পাঠ আমার অগ্রজ দ্বিজেন বন্দ্যোপাধ্যায়, অরুণ মুখোপাধ্যায় প্রমুখের কাছ থেকে পেয়েছি-বলা যায়,সেই একই ঘরানার ছাপ আমি দেখতে পাই সুদীপা’দির অভিনয়ের মধ্যে। তবে তা কেবল মঞ্চের ক্ষেত্রে নয়, বরং থিয়েটারের পাশাপাশি টেলিভিশন, টেলিফিল্ম বা চলচিত্রেও সুদীপা বসুর অনন্য অভিনয় ক্ষমতা  আমাকে আজও মুগ্ধ করে।

আমার কাছে  সুদীপা বসুর কীভাবে সুদীপা দি হয়ে উঠলেন,এই জার্নিটার কিছু কথা না বললে লেখাটা অসম্পূর্ণ থাকে। অভিনেত্রী সুদীপা বসু দর্শক হিসেবে আমায় প্রথম দেখেন ‘চলচিত্ত চঞ্চরী’ নাটকে। নাটকটা দেখে বেরোনোর পর উনি বাইরে একজন কাউকে বলে যান ‘ভবদুলাল’ চরিত্রটিতে যে ছেলেটি অভিনয় করেছে তার অভিনয় ওনার বেশ ভালো লেগেছে। কথাটা শোনার পর স্বভাবতই আমি খুব এক্সাইটেড হয়ে পড়ি।আর সেই ভালোলাগা,উত্তেজনার ঘোর থেকেই ওনার ফোন নাম্বার জোগাড় করে ফেলি। আমার অভিনয়ের কোন জায়গায় কী ভুল হয়েছে বা কী কী ওনার ভালো লেগেছে,সেটা জানার জন্য বেশ ব্যাকুল হয়ে পড়ি।আর সেই ব্যাকুলতা থেকেই বেশ খানিকটা রাতের দিকেই আমি  ফোন করে ফেলি ওনাকে। উনি ফোন তুলে একটা ফর্মাল হ্যালো বলেন। আমি ‘ভবদুলাল’ হিসেবে নিজের পরিচয় দিতেই উনি পুরো একশো আশি ডিগ্রি ঘুরে যান। প্রথমবার কথার মধ্যেই এক অসম্ভব আন্তরিকতার ছোঁয়া আমি পাই। আর সেই আন্তরিকতা থেকেই পরিচয় বাড়ে ধীরে ধীরে।আর এভাবেই সুদীপা বসুও একদিন আমার কাছে হয়ে ওঠেন সুদীপা দি।এরপর আমার বহু নাটক উনি দেখেছেন এবং সেই কাজ ভালো লাগলে ভীষণ উৎসাহও দিয়েছেন।তবে, এই কথার সূত্রেই বলবো যে শুধু আমার ক্ষেত্রে  নয়, যে কোন কাজ ভালো লাগলেই উনি বাকিদেরও একই ভাবে উৎসাহ দেন।সেই কাজ দেখার জন্য অন্যদের বলেন এবং দেখার সুযোগও করে দেন।এই যে নাম বা পরিচিতির বাইরে গিয়ে ভালো কাজের জন্য সুদীপা দি’র আন্তরিকতা, নিরন্তর উৎসাহ প্রদান- এটাই ওনার সব চেয়ে বড় গুণ।একজন থিয়েটারের মানুষ হয়ে নি:স্বার্থভাবে আরেকজন থিয়েটারের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ঔদার্যই আমার মনে হয় নাট্যকর্মী সুদীপা বসুর অন্যতম মৌলিকতা।আসলে, যে কোনও বয়সের মানুষের সাথেই সুদীপা দি খুব সহজে বন্ধুত্ব করতে পারেন। এই ইন্ডাস্ট্রিতে আমি খুব কম লোকজনকে চিনি, আমাকেও খুব কম মানুষ চেনেন। কিন্তু সবারই একজন অভিভাবক থাকে, আমার ক্ষেত্রে সেই অভিভাবক অবশ্যই সুদীপা দি। যখন যেরকম সাজেশন চেয়েছি,তখনই তা পেয়েছি ওনার থেকে। সেটা কখনও শুনেছি বা মেনেছি, আবার কখনও মানিনি। তার জন্য মনে কোনোরকম রাগ পুষে রাখা কিন্তু ওনার স্বভাববিরুদ্ধ।

একটি প্রোডাকশন নামার প্রথম স্ক্রিপ্ট রিডিং-এর দিন থেকেই উনি চরিত্রে ঢুকে যেতে পারেন।

যাই হোক,একজন অভিনেতা হিসেবে নির্দেশক সুদীপা বসুকে আমি খুব কমই পেয়েছি। কারণ আমি ওনার নির্দেশনায় গত বছরের একটি প্রোডাকশন ‘জলজ্যান্ত’তেই  কাজ করেছি। আর ‘বহিরাগত’ বলে একটি নাটকে অন্য একজনের বদলে আমি খুব স্বল্প পরিসরে  ছিলাম। আর মঞ্চ নাটকের পাশাপকশি ‘কর্ণকুন্তী সংবাদ’  শ্রুতিনাটকে  কাজ করেছি। তাই নির্দেশক সুদীপা বসুকে আমি স্বল্প সময়ের জন্য পেলেও অনেক কিছু দেখেছি, শিখেছি। উনি খুব প্যাশনেট একজন অভিনেত্রী, তাই  একটি প্রোডাকশন নামার প্রথম স্ক্রিপ্ট রিডিং-এর দিন থেকেই উনি চরিত্রে ঢুকে যেতে পারেন। রিহার্সালে কোনো চরিত্র কোনো কারণে অনুপস্থিত থাকলে উনি একাই ছেলে মেয়ে নির্বিশেষে সেই চরিত্রগুলিতে প্রক্সি দেন। ঠাণ্ডা মাথায় একাই সব দিক সামলান।নির্দেশনার সময় দেখেছি একদিকে ওনার অভিনেত্রী সত্তা যেমন চূড়ান্ত ক্রিয়াশীল থাকে,তেমনই অন্যদিকে মঞ্চ থেকে আলো, পোশাক বা কাস্টিং- সব দিকেই নজর রাখেন সমানভাবে। এমনকি খুব বেশি সময় ধরে রিহার্সাল হলে আর্টিস্টরা কি খাবেন সেটাও খেয়াল করতে ভোলেন না।কোনো হেল্প বা অ্যাসিস্টেন্ট ছাড়াই এই  সবটা কিন্তু একাই সামলান সুদীপা দি।

আগেই বলেছি,একজন নাট্যকর্মী হিসেবে তরুণ প্রজন্মকে উৎসাহ দেওয়া সুদীপা বসুর চরিত্রের এক অন্যতম দিক। ওনার কাছে কোনো কাজের ফিডব্যাক চাইলে উনি খুব সততার সাথে সেটা দেন। যা একজন অভিনেতা বা অভিনেত্রীকে তার অভিনয়ের যাত্রাপথে সাহায্য করে ভীষণভাবে। আর তার সঙ্গে থাকে নিয়মানুবর্তিতা,দায়িত্বশীল মনোভাব, সহ অভিনেতাদের প্রতি দায়বদ্ধতা। আমার এ বিষয়ে যা কিছু যেটুকু শেখা,তার অধিকাংশটাই পাওয়া দিদির কাছ থেকে।

সুদীপা বসু অভিনীত সেরা কয়েকটি নাটক

এখন কেউ যদি সুদীপা বসু অভিনীত সেরা কয়েকটি নাটক আমায় বাছাই করতে বলে,আমার পক্ষে সেটা খুব মুশকিল হয়ে যায়।কারণ আমি আগেই বলেছি আমি মফঃস্বলের ছেলে, তাই অত নাটক দেখার সুযোগ হয় নি। তবুও সুদীপা দি’র ‘বাসভূমি’, ‘কর্নাবতী’, ‘কিং লিয়ার’, ‘কলকাতার ইলেকট্রা’র কথার না বললেই নয়। এই সবকটিতেই দিদির অভিনয় দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছি,আআপ্লুত হয়েছি।বিশেষ করে,‘বাসভূমি’ ও ‘কর্নাবতী’।এই দুটো নাটকে একদম বিপরীত মেরুর দু’রকম অভিনয় আমার আজও বারবার মনে পড়ে। ‘বাসভূমি’তে মুম্বাই থেকে ফেরা ঝাঁ চকচকে একটি মেয়ের চরিত্রের পাশেই ‘কর্ণাবতী’তে রাজস্থানের ঠাকুর পরিবারের রক্ষিতা একটি নারীর অভিনয়,ভাবলে আজও বিস্মিত হই। আবার  ‘কিং লিয়ার’এ অনেকগুলি পার্শ্বচরিত্রের মধ্যেও প্রমিনেন্ট একটি চরিত্রে ওনার অভিনয় সত্যিই মনে রাখার মতো। শুধু মঞ্চে নয়, ‘এক আকাশের নীচে’র মতো খুব জনপ্রিয় ধারাবাহিকেও সুদীপা বসু ও রজতাভ দত্ত’র জুটির কাজ দর্শক হিসেবে আজও যেন চোখে ভাসে।

টেলিভিশন যেহেতু অনেক বেশি পপুলার একটা মাধ্যম,তাই অস্বীকার করার জায়গা নেই যে মঞ্চ অভিনেত্রীর চেয়ে সিরিয়ালের অভিনেত্রী হিসেবে সুদীপা বসুর পরিচিতি বা জনপ্রিয়তা অনেকটাই এগিয়ে।আসলে,এই মাধ্যমটায় খুব সহজেই বহু মানুষের কাছে নিজের অভিনয়কে পৌঁছে দেওয়া যায়,যে সুযোগ মঞ্চের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সীমিত।  তাই পর্দার দর্শকদের কাছ থেকে ভালোবাসা অর্জন করার জায়গাটাও অনেক বেশি। তবে,আমি যতদূর জানি অভিনেত্রী হিসেবে মঞ্চ সত্তাটাই সুদীপা দির ব্যক্তিগতভাবে বেশি প্রিয়।সেখানে বেশি সংখ্যক লোকে তা দেখছে না কম ,তা হয়তো  সত্যিই অপ্রয়োজনীয়।আর মাধ্যম আলাদা হলে অভিনয়ের মানের তো কোন হেরফের হয় না,তাই একজন অভিনেতা বা অভিনেত্রী যদি নিজের কাজের প্রতি সৎ ও দায়বদ্ধ  হন তাহলে সমস্ত মাধ্যমই তাঁর কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ। দায়িত্ববোধ থাকলে সব জায়গাতেই ভালো কাজের প্রতিফলন পড়বে।হ্যাঁ,এটা হয়তো ঠিক যে  টেলিভিশনের দর্শকরা সিরিয়াল অভিনেত্রী সুদীপা বসুকে বেশি চেনেন, জানেন, ভালোবাসেন… কিন্তু তা নিয়ে আক্ষেপ করাটা অনর্থক,আর এটা ভাবাও অর্থহীন যে এতে থিয়েটারের অভিনেত্রী হিসেবে সুদীপা বসুর প্রতি অবিচার হলো।কিন্তু সেই সঙ্গে একজন দর্শক এবং শিল্পী হিসেবে আমি এই কথাও বলবো,বাংলা থিয়েটার বা আমাদের এই ইন্ডাস্ট্রি সুদীপা বসু’র প্রতিভাকে সেইভাবে কাজে লাগাতে পারেনি। অভিনেত্রী হিসেবে বা শিল্পী হিসেবে যে সম্মান তাঁর প্রাপ্য তিনি তা এখনো পাননি।

তবে ব্যক্তিগত জায়গা থেকে নির্দ্বিধায় স্বীকার করবো বারবার, সুদীপা বসু’র কাছ থেকে আমি অনেক কিছু শিখেছি, পেয়েছি। আজকের নতুন প্রজন্মও ওনার কাছ থেকে অনেক কিছু শিখে নিতে পারে। প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ দু’ভাবেই সেই শেখা সম্ভব। এক, সরাসরি ওনার সান্নিধ্যে থেকে কাজ করে এবং দুই মঞ্চে তাঁর অভিনয় দেখে অনেক কিছু শিখে নেওয়া সম্ভব।যা নিজেকে একজন ভালো মানুষ, ভালো অভিনেতা ও ভালো নাট্যকর্মী হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।একজন দর্শক হিসেবে  আমার  সুদীপা বসুর আরও অভিনয় দেখার ইচ্ছে তো রয়েইছে এবং  একজন অভিনেতা হিসেবে ওনার নির্দেশনায় আরও কাজ করার ইচ্ছেও প্রবল।তবে কেবল থিয়েটার নয়, সকল মাধ্যমে সুদীপা দি না হয় আমাদের জন্যই  আরও ভালো,নতুন কাজ করুক,যা থেকে আগামিদিনে আমরাও শিখে নেবো অনেককিছু। একজন শিল্পী বা দর্শক হিসেবে সেটাই আমার সব থেকে বড় চাওয়া….

শেয়ার করুন