বিভাজন! কিসের ভিত্তিতে? কেন?

(“বিভাজন” দেখে লিখলেন – সৌমেন দাস)

‘তোষণ’ এই শব্দটা ইদানীং খুব শোনা যাচ্ছে। আরও পরিষ্কার করে বললে ‘সংখ্যালঘু তোষণ’। আরও একটু পরিষ্কার করলে ‘ধর্মীয় সংখ্যালঘু তোষণ’। আরও বললে ‘মুসলিম তোষণ’। আচ্ছা এই কথাটা এতো প্রকট হয়ে উঠলো কেন? একটি সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দলের ক্ষমতায় আসা এবং তাদের বাড়বাড়ন্ত এই কথাটাকে প্রকট করলো? নাকি প্রকাশ্যে আনলো? বেশ জটিল প্রশ্ন! কি বললেন? “একটু হীনও বটে!” আপনি কি বলছেন? “প্রগতিশীলতার পরিপন্থী”! আর আপনি? “সাম্প্রদায়িক!” থাক তবে। আমার আবার কেঁচো খুঁড়তে ভীষণ ভয়! বার বার মনে হয় যদি অ্যানাকোণ্ডা বেরিয়ে পড়ে! তার চেয়ে বরং চলুন একটু বাংলা থিয়েটারের আঙিনায় ঘুরে আসা যাক। ‘চোখ’ নাট্য দলের প্রযোজনা ‘বিভাজন’ নাটকটি দেখলাম। একটি সমসাময়িক ভালো প্রযোজনা। সময় করে দেখে ফেলুন ভালো লাগবে। নাট্যকার, পরিচালক অভিজিৎ করগুপ্ত।

অভিনেতা অভিনেত্রীরা তাঁদের চরিত্রে যথাযথ। তবে আলাদা করে বলতেই হয় তিন্নী চরিত্রাভিনেত্রী দিশারী করগুপ্তের কণ্ঠস্বর ভারী চমৎকার।

তথাকথিত শিক্ষিত হিন্দুর মুসলমান বিদ্বেষ, তথাকথিত শিক্ষিত মুসলমানের হিন্দু বিদ্বেষ আর শিক্ষিত প্রগতিশীল হিন্দু মুসলমানের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার তীব্র প্রচেষ্টা, নাটকের মূল বিষয়। পুত্র জোজো(আত্মদিপ ঘোষ), কন্যা তিন্নী(দিশারী করগুপ্ত) ও স্ত্রী মৈত্রেয়ী(নিবেদিতা করগুপ্ত) কে নিয়ে ব্রতীন(তাপস সরকার)-বাবুর সংসার। ওই পরিবারের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং ব্রতীন-এর ভীষণ প্রিয় বন্ধু প্রগতিশীল লেখক রহমান(নীলাঞ্জন সাহা)কে নিয়ে নানান ঘাত প্রতিঘাতের মধ্যে আবর্তিত হতে থাকে নাটকের গপ্প। উঠে আসে এক সম্প্রদায়ের প্রতি অপর সম্প্রদায়ের বাজার চলতি কটূক্তি, শ্লেষ। উঠে আসে তার বিরোধিতাও। উঠে আসে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের গরল। উঠে আসে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অমৃত। সবই হয়। আর সবই হয় ভীষণ মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে। হ্যাঁ এটার দরকার, আর ভীষণ প্রাসঙ্গিকও।

আজ সভ্যতা এমন এক সংকটে দাঁড়িয়ে আছে সেখানে থিয়েটারের কর্তব্য, দায়িত্ব সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার কথা মানুষকে ভীষণ ভাবে বলা। উদ্বুদ্ধ করা সম্প্রীতি রক্ষায়। অসাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ আর প্রতিরোধ গড়ে তোলা। মানুষকে সচেতন করা। “লোক শিক্ষে”আরকি। সেটা এই বিভাজন নাটকটি করেছে। করছে। হয়তো আরও অনেক নাট্যদল এই গুরু দায়িত্বটি পালন করছেন। কিন্তু আমার বারবার মনে হচ্ছে আর একটা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ কাজ কি রকম যেন নেপথ্যেই থেকে যাচ্ছে, ঠিক সেরকম ভাবে প্রকাশ্যে আসছে না। আমার মনে হয় সেই কাজটা বেশী করে হওয়া উচিৎ, প্রকাশ্যে আসা উচিৎ। এটা থিয়েটারের আশু কর্তব্য। আমার বিশ্বাস শুধুমাত্র মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার আহ্বান এই সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। দরকার সঠিক রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ এবং বিশ্লেষণ।

এই সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের উৎস কোথা থেকে?

কেন এটা বংশপরম্পরায় বজায় আছে? কারা বজায় রাখছে? কি তাদের স্বার্থ? কি লাভ?

একটা সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পরিবেশ নষ্ট করছে, সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়াচ্ছে – কি করে পারছে?

এতে অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল বা দলগুলোর ভূমিকা কি? অবদানই বা কতোটা?

যদি খুব ভুল না করি সংখ্যাতত্ত্বের বিচারে অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল সংখ্যাগুরু আর সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল সংখ্যালঘু – তবু তারা সফল হচ্ছে কি করে? শুধু মাত্র কেন্দ্রে ক্ষমতায় আছে বলে? না কি অন্য কোন সমীকরণও আছে?

আসলে কি অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দল বলে কিছু আছে? ছিল কোন কালে?

একটা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা পরিস্থিতি তৈরি হলে প্রথমেই তাকে কঠোর ভাবে দমন করা যাচ্ছে না কেন? কেন তাকে বাড়তে দেওয়া হচ্ছে? এতে কার কি স্বার্থ কাজ করছে? কিম্বা কোন গোপন নোংরা অভিসন্ধি?

বিভাজন! কিসের ভিত্তিতে? জাত! ধর্ম! ভাষা! রাজনীতি! আরও কি কি? কেন?

হয়তো এইরকম আরও অনেক প্রশ্ন আছে। আর এই সব প্রশ্নের অনুসন্ধান করতে হবে থিয়েটারকে। মানুষের সামনে আনতে হবে প্রকৃত সত্যটা। এটা থিয়েটারের কাজ। এটা থিয়েটারের কর্তব্য। এটা থিয়েটারের দায়।

 

One Comment

  1. সম্পূর্ণ ব্যক্তিগতভাবে আমার অন্তরের সহবাস হোল এই লেখায় ---আমি তৃপ্ত, তবে তৃষ্ণা কি সহজে মেটে, আমি পারিনা কিন্তু পিপাসা যেন বাড়ছে এই লেখা পড়ে, আরও আরও চাই ---ঝদ্ধিতা পূর্ন হোক ---

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *