পোস্টমাস্টার: একটি ব্যতিক্রমী প্রযোজনা

শেয়ার করুন

বহুপঠিত, বহুশ্রুত সাহিত্যকে পরিবেশন করতে গেলে একধরণের সাহস ও শৈল্পীক মুন্সীয়না লাগে। কারণ, বেশিরভাগ দর্শকের কাছেই নাট্যকাহিনী নিয়ে আলাদা কোনো আগ্রহ থাকেনা। বরং একধরণের ক্লান্তি শুরুতেই দর্শকমনকে আচ্ছন্ন করতে পারে। চর্বিতচর্বণের ক্লান্তি। তখন একজন নাট্যনির্দেশকের কাছে প্রয়োগগুণই প্রধান অবলম্বন হয়ে দাঁড়ায়। তার উপর সে সাহিত্য যদি রবীন্দ্রসৃষ্টি হয় তাহলে সমস্যা আরো গভীরতর হয়ে ওঠে। বাঙালি বার বার রবীন্দ্রনাথকে অতিক্রম করতে গিয়ে রবীন্দ্রআবর্তে ঘুরে মরেছে। অন্যদিকে তাঁকে আত্মস্থ করেই অনেকে খুঁজে পেয়েছেন নিজস্ব শিল্পভাষা, এ উদাহরণও বাংলা শিল্প-সংস্কৃতির ইতিহাসে কম নেই। থিয়েটার শাইন প্রযোজিত, শুভজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় নির্দেশিত রবীন্দ্রনাথের পোস্টমাস্টার নিঃসন্দেহে একটি ব্যতিক্রমী প্রযোজনা। পরিচালক বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছেন গল্পকারের প্রতি অনুগত থেকে।

মিনিয়েচার বাড়ি-ঘর-নৌকা-গাছপালা দর্শককে যেন প্রেক্ষাগৃহের ছোট্ট পরিসর থেকে বারে বারে নিয়ে গেছে প্রকৃতির বিশাল ক্যানভাসে

থিয়েটার শাইন তাঁদের বিজ্ঞাপনে প্রযোজনাটিকে সঠিক অর্থেই গল্প নির্মাণ বলে উল্লেখ করেছেন, প্রথাগত ন্যারেশনের সঙ্গে উপযুক্ত দৃশ্যকল্প নির্মাণে প্রযোজনাটি আরো চিত্তগ্রাহী হয়ে উঠেছে। অন্তরঙ্গ পরিসরের সমস্ত খুঁটিনাটি কে কাজে লাগিয়ে টেবিল টপ থিয়েটাররের ধাঁচে পরিবেশিত হয়েছে মূল আখ্যানভাগ। জড় বস্তুসমূহের সঙ্গে জীবন্ত অভিনেতাদের পারস্পরিক সম্পর্ক তাতে কোথাও ব্যাহত হয়নি এতটুকু। বরং মিনিয়েচার বাড়ি-ঘর-নৌকা-গাছপালা দর্শককে যেন প্রেক্ষাগৃহের ছোট্ট পরিসর থেকে বারে বারে নিয়ে গেছে প্রকৃতির বিশাল ক্যানভাসে। অভিনয়ক্ষেত্রের দুদিকে দুটি আয়নার ব্যবহারে চরিত্রগুলোর সাথে দর্শকও যেন নিজের অন্তর্জগৎকে ক্ষনিকের জন্যে দেখতে পায়। যদিও কথকের মুখ আমরা দেখতে পাই না তার কণ্ঠস্বর আর পরিবেশনা নাটকের মূল গল্পের ভার বহন করে। কথক নম্রতা মুখার্জী সেই দায়িত্ব দক্ষতার সাথে নির্বাহ করেছেন। রতনের চরিত্রে ইরিনা ভৌমিক নজর কারে তার সরল মুখমণ্ডল ও অভিনয়ের সুক্ষতায়। সৌরভ চক্রবর্তী পোস্টমাস্টারের ভূমিকায় তার অভিনয় দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন।

সৌভিক হালদারের সঙ্গীত দর্শকের মনোসংযোগ আরো গভীর করে তোলে, তার চমৎকার প্রয়োগ কাঙ্ক্ষিত পরিবেশ সৃষ্টি করে। অনন্যা ঘোষ ও অন্বেষা নন্দীর আলোক পরিকল্পনা বেশ অন্যরকম। অন্য মাত্রা যোগ করে অনিরুদ্ধ বিশ্বাসের তাৎক্ষণিক আঁকা বিমূর্ত চিত্ররূপায়ন। শিল্পের বিভিন্ন মাধ্যমের ব্যবহারে নির্দেশক শুভজিৎ এই নাট্যে সমসময়ের দর্শকের বদলে যাওয়া দেখাটাকে বুঝতে চেয়েছেন। দৃষ্টিমধুর হলেও প্রযোজনার ডিজাইন কোন কোন সময়ে গল্পের সরলতাকে ছাপিয়ে যায়। আমরা চমকীত হই কিন্তু রতনের জন্য বিষাদগ্রস্থ হই কি? আর শেষে নারীমনের গহন গভীরতাকে কোনো নির্দিষ্ট সম্পর্কের চাহিদার ইঙ্গিতে বেঁধে ফেলতে পারি কি? হয়তো… আসলে সমসময়ে অন্তরঙ্গ নাট্য আঙ্গিক নিয়ে যে মেধাবী নিরীক্ষা শুরু হয়েছে এই নির্মাণ তার এক অনবদ্য সংযোজন।

শেয়ার করুন