পাসওয়ার্ড: সামাজিক সম্পর্কে আবরিত যন্ত্রণা ও ভালোবাসার গল্প

শেয়ার করুন

দ্বিতীয় পর্যায়ের লকডাউন পেরিয়ে বাংলা থিয়েটার যখন আস্তে আস্তে তার পুরোনো লয়ে ফিরছে, নাট্য দলেরাও ধীরে ফিরছেন তাদের চেনা ছন্দে তাদের নবতম বা সাম্প্রতিক প্রযোজনা নিয়ে, যার হয়তো দুটো কিংবা তিনটের বেশি মঞ্চায়ন হয় নি। মহামারী নিঃসন্দেহে অনেক বদল এনেছে আমাদের জীবনযাত্রায় কিন্তু পাঁচ দশক ধরে যে নাট্যদল নিজের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে ধারাক্রমে তাদের নাট্যচর্চা করে যাচ্ছেন, পরিস্থিতি তাদের সাময়িক ভাবে নিরুদ্ধ করলেও বেঁধে রাখতে পারেনি। গত ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, নাট্যরঙ্গের পঞ্চাশ তম বর্ষযাপনের প্রথম অনুষ্ঠান আকাদেমি অফ ফাইন আর্টসে তাদের নবতম নাট্য “পাসওয়ার্ড”-এর অভিনয় দিয়ে সূচনা হয়।

তাজুদ্দিন আহমেদ-এর মূল কাহিনীকে বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে এনে নাট্যরূপ দিয়েছেন মৈনাক সেনগুপ্ত। দেশ ভাগের যন্ত্রনা, বন্ধু বিচ্ছেদ, দৈনন্দিন সম্পর্কের নান টানাপোড়েন ও ধর্মীয় মৌলবাদের কদর্যতার এক অদ্ভুত মিশ্রণ রয়েছে এই নাটকে। নাটকের মূল চরিত্র এক হাসিখুশি দম্পতি, সুখময় ও সুমিতা। তাদের ছেলে চাকরি সূত্রে বাইরে থাকে। ছোট এই পরিবারের কর্তা সাফ মনের মনোরম মানুষ, যে তার বৌয়ের আপত্তি সত্ত্বেও এক মুসলমান যুবক, রফিককে ঘর ভাড়া দেন। তাদের মধ্যে এক অদ্ভুত সম্পর্ক তৈরী হয়। এই নাটকের বিভিন্ন পরতে লুকিয়ে আছে ছোট ছোট অনেক অনু ঘটনা যা দর্শকদের মনোসংযোগ কে একটানা ধরে রাখতে সাহায্য করে। রফিকের দৈনন্দিন লড়াই, দীপালির ভালোবাসা, সুখময়ের অসুস্থতা, তার ফেলে আশা বন্ধুত্ব, তার চিঠি; এই সব ঘটনা এক সুন্দর সূত্রে বেঁধেছেন নির্দেশক স্বপন সেনগুপ্ত। তৈরী করেছেন বহু মুহূর্ত, যা কখনো আমাদের মন ভালো করে দেয়, আবার কখনো বিষণ্ণ। নাটকের নামের রহস্য প্রকাশ পায় গল্পের প্রায় শেষ ভাগে।

নাটকের দ্বন্দ্ব সহজেই দর্শকদের মধ্যে সঞ্চারিত হয়, আর সেই দ্বন্দ্বের মধ্যে থেকেই উত্তর খুঁজে নেবার চেষ্টা করে তাঁরা।

মঞ্চভাবনার ক্ষেত্রে বিলু দত্ত ভীষণ মিনিমালিস্ট অ্যাপ্রোচ নিয়েছেন; তিনটি জোনে বিভক্ত করেছেন মঞ্চকে। অপ্রার্থিত কোনো সজ্জা তিনি ব্যবহার করেন নি যা নাটকের গল্প কে ছাপিয়ে যায়। এই পরিকল্পনাকে যথাযথ সঙ্গত করেছে জয়ন্ত দাসের আলো ও অনিন্দ্য নন্দীর আবহ। সুখময়ের চরিত্রে সায়ন্তন রায়চৌধুরী ও সুমিতার চরিত্রে এনা সেনগুপ্তর অভিনয় প্রশংসনীয়। তাদের সাবলীল যুগলবন্দী নাটকের চলনকে শক্ত করে বেঁধে রাখে। সংলাপ নির্ভর এই নাটকের মূল চালিকাশক্তি অভিনয়। রফিক আর দীপালির চরিত্রে অভিজিৎ লাহিড়ী ও জুঁই বাগচী পরস্পরকে কমপ্লিমেন্ট করে, তাদের অভিনয়ের মধ্যে একটা সুন্দর সহজতা লক্ষ্য করা যায় যা তারা অনায়াসে ফুটিয়ে তোলেন তাদের চরিত্রে। নাটকের দ্বিতীয়ার্ধে সুখময়ের অসুস্থতার কে আরো যুক্তিগত ভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারতেন নির্দেশক। এই নাটকের একটি উল্লেখ্য বিষয় হলো মঞ্চ ব্যবহার। নির্দেশক স্বপন সেনগুপ্ত পরিমার্জিত ভাবে প্রত্যেকটি চরিত্রকে মঞ্চ জুড়ে ব্যবহার করেছেন, যা এই নাটককে এক অন্য মাত্রা দিয়েছে।

চারপাশের হতাশা, বিভ্রান্তি, অস্থিরতা, সম্পর্কের জটিলতার ও নিজের মধ্যে লুকিয়ে থাকা মনুষ্যত্বের মুখোমুখি দাঁড় করায় “পাসওয়ার্ড”। নাটকের দ্বন্দ্ব সহজেই দর্শকদের মধ্যে সঞ্চারিত হয়, আর সেই দ্বন্দ্বের মধ্যে থেকেই উত্তর খুঁজে নেবার চেষ্টা করে তাঁরা।

শেয়ার করুন