Chakdaha Nattyajan Kamli Katha

কমলী কথা: আলকাপ আশ্রিত এক ভিন্ন স্বাদের নাট্য

শেয়ার করুন

বাঙালি জাতির ইতিহাস হাজার বছরেও বেশি পুরোনো। বাংলার গ্রামীন সংস্কৃতির এই দীর্ঘ ঐতিহ্যময় ইতিহাসের এক বড় অংশ, যার মধ্যে আছে আমাদের বহুল চর্চিত ও জনপ্রিয় লোকনাট্য রীতি। এই চর্চার সময়ের সাথে পরিবর্তন ঘটলেও, আজও সে নিজ রূপে বর্তমান। খন, কুশান, লেটো, দোতরা, আলকাপ, ডোমনী মতো অনুষ্ঠানভিত্তিক লোকাচার নির্ভর গ্রামীণ নাট্য আজও অনায়াসে মানুষকে টেনে নিয়ে আসে তাদের আসরে। প্রচলিত মঞ্চনাট্যে লোকনাট্যের বিভিন্ন আঙ্গিক ব্যবহৃত হয়েছে বহু বার। কখনো মঞ্চ সেজে উঠেছে গ্রামীণ উৎসবের আদলে, কখনো লোকনাট্যের নাচ বা গীতি নাট্যের বুননকে আরো শক্তিশালী করে তুলেছে। আলকাপ গান পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ, বীরভূম ও মালদহ অঞ্চলের প্রচলিত একটি লোকনাট্য ধারা। হাস্যরসের প্রাচুর্য আর নৈতিকতার পাঠ বিশিষ্ট এই লোকশিল্প আশ্রিত নাটক আগেও অভিনীত হয়েছে কলকাতা মঞ্চে, কিন্তু চাকদহ নাট্যজনের সাম্প্রতিক প্রযোজনা “কমলী কথা” একটু ভিন্ন ধারার। প্রথমত এই নাটককে বাঁধা হইছে আলকাপ রীতিতে; আলকাপের পঞ্চ ইন্দ্রিয়- বন্দনা, ছড়া, কাপ, বৈঠকী গান আর খেমটা পালার রসদ পাওয়া যায় এই নাট্যে। সমস্যার উদভাবনা এবং তার সমাধানের খোঁজা, যা আলকাপ গানের মূল অঙ্গ, তারও প্রদর্শন আছে এই নাটকে। দ্বিতীয়ত এই নাট্য শুধু মঞ্চে নয়, অঙ্গনেও অভিনীত হতে পারে সমান দক্ষতায়।

ছুকরি কমলীর জীবন, তার ভালোবাসা, তার শিল্পসত্তা, তার সামাজিক পরিচয়, তার নানা টানাপোড়েনকে ঘিরে এই নাটকের গল্প। একটি পুরুষ যে চর্চায়, মননে নারী হই ওঠে, আসর জমায় আলকাপ পালার মধ্যমনি হয়ে, তার সাজানো জীবনে ভালোবাসা আসে, কিন্তু তা চিরস্থায়ী হয় না। অনিচ্ছা সত্বেও তাকে ফিরে আসতে হয় তার উপজীব্যে। এক শিল্পীর হেরে যাওয়া, তার নিজের সত্তার সাথে তার নিত্যদিনের লড়াই, কোথাও আমাদেও এক উপেক্ষিত সামাজিক আয়নার সামনে দাঁড় করায়। অনেক প্রশ্নের সম্মুখীন হই আমরা, যার সব উত্তর হয় তো এই নাট্যে মেলে না; যার অনেকটা হয় তো আমরা বুঝিও না, যেমন পুরুষের মধ্যে আবৃত নারী সত্তা অথবা একটি পুরুষের নারী হই ওঠা।

রাহুল দেব ঘোষ আলকাপ এর বর্ণনা ও তার সাথে সংশ্লিষ্ট শিল্পীদের সংকট আর মানসিক যন্ত্রনাকে সূক্ষ্ম ফুটিয়ে তুলেছেন এই নাটকে

নাটককার দীপক নায়েক বহু বছর বাংলার গ্রামে নাট্যচর্চা করছেন। খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষের সাহচর্য তাকে এই গল্পের চরিত্রগুলোকে আরো স্পষ্ট ভাবে ফুটিয়ে তুলতে সাহায্য করেছে। নির্দেশক রাহুল দেব ঘোষ আলকাপ এর বর্ণনা ও তার সাথে সংশ্লিষ্ট শিল্পীদের সংকট আর মানসিক যন্ত্রনাকে সূক্ষ্ম ফুটিয়ে তুলেছেন এই নাটকে। শুধু মাত্র আলকাপ গান নয় এই নাটকে সমকালীন লোকশিল্পীদের বেঁচে থাকার লড়াই ও তাদের জীর্ণ অবস্থানের কথাও তুলে ধরেছেন তিনি। আলকাপ ধারায় আশ্রিত হলেও, মূল লোকনাট্যের বৈশিষ্টের অভাব নাট্যজনের অভিনেতাদের মধ্যে দেখা যায়। অভিনেতাদের উচ্চারণ স্মার্ট শহর কেন্দ্রিক মানুষদের মতো, তাদের অঙ্গ-ভঙ্গিতেও শ্রমজীবী মানুষের ছাপ নেই। এই নাট্যের ড্রিম সিকোয়েন্স বা একাধিক সিনোগ্রাফির ব্যবহার আকর্ষণীয় হলেও কোথাও যেন গল্পের বুনন বা বর্ণনাকে ছাপিয়ে যায়।

কমলী কথায় সব চরিত্রই গুরুত্বপূর্ণ, প্রত্যেকেই যথাযথ নিজের ভূমিকা পালন করেছেন, কিন্তু চার অভিনেতার কথা আলাদা করে বলতেই হয় – কমলীর চরিত্রে প্রিয়াংশু দাস, শরিফুলের চরিত্রে সুমন পাল, বংশীর চরিত্রে সৌরব বিশ্বাস ও মাস্টারের চরিত্রে পলাশ দাস। এই নাটকের মঞ্চ করেছেন নীল কৌশিক। সীমিত মঞ্চসজ্জা, ও ব্যাকড্রপ-এর ব্যবহারে তার মুনশিয়ানার ছোঁয়া পাওয়া যায়। নির্দেশক রাহুল দেব ঘোষ নাটকের আবহ নির্মাণ করেছেন। খুব সামান্য অংশ ছাড়া, এই নাটকের সম্পূর্ণ আবহ মঞ্চেই তৈরী হয়। ঢোলে অভিজিৎ বিশ্বাস, হারমোনিয়ামে বিমল দাস ও বাঁশিতে ধনঞ্জয় বিশ্বাস নাটকের ছন্দ ও লয় কে দক্ষতার সাথে ধরে রাখেন।

কমলী কথা কি একটি সার্থক আলকাপ আশ্রিত নাটক হয়ে উঠবে? লোক সংস্কৃতির থেকে দূরে থাকা মানুষেরা কি এই নাট্য দেখে তাদের লোকনাট্য রীতির সম্পর্কে অবগত হবেন? এই প্রশ্নের উত্তর হয়ত সময় নিজেই দেবে, কিন্তু চাকদহ নাট্যজনের মত তরুণ দলের কর্মকান্ডের বৈচিত্র্য ও উদ্দীপনার ধারাবাহিকতা লোকসংস্কৃতিকে আরো বৃহৎ পরিসরে ছড়িয়ে দেবে এই আশা আমরা করতেই পারি।

শেয়ার করুন