বঙ্গ-রঙ্গে দারিও ফো-এর ‘হালুম’ এক জোরালো গর্জন

ফিরে দেখা – হালুম

“For the people, the theatre has always been the chief medium of expression, of communication, but also of provocation and agitation through ideas. The theatre is the spoken newspaper of the people in Dramatic form”.
Dario Fo

কনটেন্ট বা বিষয়ের প্রশ্নে বাংলা থিয়েটারের স্বাতন্ত্র সর্বজনবিদিত। কে না জানে বাংলা রঙ্গমঞ্চে রাজনৈতিক থিয়েটারের এক সুগভীর, মননশীল নাট্যচর্চার মর্যাদাপূর্ণ ঐতিহ্য রয়েছে। বাংলা থিয়েটারে রাজনৈতিক নাটকের উপস্থিতি এতই প্রবল এবং প্রাচুর্যপূর্ণ যে তার দীর্ঘ তালিকা এই আলোচনায় জুড়লাম না। শুধু এইটুকু বলবো যে, এই রাজনৈতিক নাটকের ক্রমবিকাশের ধারায় বাংলা রঙ্গমঞ্চে আবির্ভূত হয়েছেন ইতালীয় নোবেলজয়ী ‘দারিও ফো’। আমরা অনেকেই অবগত আছি যে দারিও ফো অনুপ্রাণিত শ্রী বিভাস চক্রবর্তী মহাশয়ের রূপান্তর ও নির্দেশনায় এবং নান্দীপট নাট্যগোষ্ঠীর প্রযোজনায় ‘মৃত্যু না হত্যা’ (মূল নাটক An Accidental Death of an Anarchist) নাট্যটি কি প্রবল সাড়া ফেলেছিল বাংলার নাট্যমোদি দর্শককূলের চিত্রপটে। দারিও ফো-র রচনাশৈলীর সঙ্গে যাঁরা পরিচিত তাঁরা জানেন যে কী নিপুণ নির্মাণে একটি আদ্যপান্ত সিরিয়াস রাজনৈতিক বিষয়কে প্রহসনের মোড়কে মুড়িয়ে উপস্থাপন করতেন তাঁর পাঠককূলের সম্মুখে। তাঁর দর্শক হাসতে হাসতে উপভোগ করেন নাট্য যখন তিনি কোনরকম রাখঢাক না রেখেই সম্পূর্ণ নগ্ন করেছেন রাষ্ট্রের অন্যায় ও হিপোক্রেসি। আর পাশাপাশি প্রতিষ্ঠা করেছেন তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শ। ‘Aবং পজিটিভ’ নামের একটি তরুণ নাট্যগোষ্ঠী যখন বাংলা থিয়েটারের রাজনৈতিক ঐতিহ্যকে মাথায় রেখে নির্বাচন করেন বিশ্ববন্দিত নাট্যকার দারিও ফো কৃত ‘The Tale of a Tiger’ (ইতালীয় ভাষায় La storia di una tigre) তখন শুধুমাত্র এই নির্বাচনের জন্য তারা খানিকটা প্রশংসা দাবী করেন বইকি। দারিও ফো-র ‘The Tale of a Tiger’ শাশ্বত শিকদারের বঙ্গীকরণে হয়েছে ‘হালুম’। ১৯৭৫ সালে নাট্যকার চীন ভ্রমণকালে এই নাটকের বিষয়টি সংগ্রহ করেছিলেন। যদিও পূর্বেই তিনি এই নাটকের বিষয়টি শুনেছিলেন চৈনিক রাজনীতি ও সংস্কৃতি বিষয়ক প্রখ্যাত গবেষক Enrica Collotti Pischel-এর নিকট। তবুও তা ছিল নিতান্তই একটি গল্পের রূপরেখা মাত্র। গোটা গল্পটি তিনি জানতে পারেন সাংহাই প্রদেশের একটি গ্রাম্যপ্রান্তরে এক লোক শিল্পীর (অভিনেতা) নিকট।

 মূল গল্পটা এইরূপ- মাও-জে-দং-এর বিখ্যাত ‘লং-মার্চ’ এর সময় জনৈক চৈনিক বিপ্লবী সৈনিক বুলেট বিদ্ধ হন এবং তার ক্ষত গ্যাংগ্রীন-এ পরিণত হয়, একসময় তিনি তার কমরেডদের বলেন তাকে ত্যাগ করতে, তারপর সে বহু পথ অতিক্রম করে একটি গুহায় আশ্রয় নেয় এবং গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়। জেগে উঠে দেখতে পায় তার সম্মুখে এক বাঘিনী ও তার ছোট্ট শাবক, তাতে সে প্রানভয়ে শুকিয়ে যায় (নাট্যে বর্ণিত আছে শরীরের যা-যা শুকনো সম্ভব)। শাবকটি জলে পড়ে গিয়ে জল খেয়ে পেট ফুলে ছিল বলে স্তন্যভারে জর্জরিত বাঘিনীর স্তন্যপান করে সৈনিকটি নিজেও সুস্থ হয় এবং বাঘিনীও স্বস্তি পায়। বাঘিনী সৈনিকের ক্ষতস্থান চেটেপুটে তাকে সুস্থ করে তোলে। এমনি কমিক বিবৃতিতে গপ্পো এগোয় আর জমে ওঠে তাদের গৃহস্থলী। একসময় সৈনিকটি ফিরে আসে লোকালয়ে, তার পিছু পিছু বাঘিনী আর ছানাটিও চলে আসে। সেখানে ঘটনাচক্রে বাঘিনী ও তার শাবক মাথা-ব্যথার কারন হয় স্থানীয় প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক মহলের। কী কী ঘটনা ঘটে? – এইসব অনুপুঙ্খ ঘটনা আর বিবৃত করলাম না, তাহলে নাট্যটি দেখার আগ্রহ বাস্পায়িত হবে।

মূল আখ্যানটি অক্ষুণ্ণ রেখে নির্দেশক দেবরাজ ভট্টাচার্য ভারতীয় প্রেক্ষাপটে নির্মাণ করেছেন নাট্য-শরীর

মূল আখ্যানটি অক্ষুণ্ণ রেখে নির্দেশক দেবরাজ ভট্টাচার্য ভারতীয় প্রেক্ষাপটে নির্মাণ করেছেন নাট্য-শরীর। শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট কালগণ্ডিতে সীমায়িত করতে চান নি তিনি, বরং বিষয়টিকে কালোত্তীর্ণ করতে চেয়েছেন সাদা-কালোর চিরায়ত দ্বন্দে (তবে অবিশ্যি আখ্যানভাবে আমেরিকা ও জাপানের নাম ধন্দ জাগায় মনে)। ইতিহাসে ক্ষমতা ও শাসকবর্গের চরিত্রগত কোনো পরিবর্তন নেই – তা হোক না ইটালীর মিলান, ব্রিটিশ ইন্ডিয়া, স্বাধীন ভারতের কংগ্রেসী শাসন বা বিজেপি শাসন (এমনকি বর্তমানে বাংলার রাজনৈতিক শাসন)। তাই নাট্যে অনিবার্যভাবে এসে ভিড় জমায় হরিনাম সংকীর্তনে মোহাবিষ্ট জনতা, জনৈক গৈরিক নেতার হরিনাম সমৃদ্ধ ভাষণ এবং বর্তমান বাংলা তথা

ভারতীয় রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী নেত্রীর ছায়াময় উপস্থিতি লক্ষ্য করার মতো। বাঘ ব্যান্ডমাষ্টারের মুরগী ব্যান্ডমাষ্টারে পরিণত হওয়ার রূপকধর্মীতা বিশেষ নাটকীয় অভিঘাত সৃষ্টি করে। গেরুয়া শিবিরের এক নেতার ভূমিকায় একজন শিশু অভিনেতাকে ব্যবহার নির্দেশকের ভাবনার দিকটি প্রসারিত করে। আখ্যানভাগ তিনজন অভিনেতা বিবৃত করেন (অনিমেষ ঘোষ, সঞ্জু আইচ ও বাপ্পা)। প্রত্যেকেই নিজ নিজ ভূমিকায় সাবলীল অভিনয় করেছেন-তবে দ্বিতীয় জনের বাচিক অভিনয়ে যত্নশীল হতে হবে। বাঘিনী (অনীক রায়) এবং বাঘের ছানা (অর্ক সেন এবং সায়ক সেন) এর প্রায় সংলাপহীন শারীরিক মুখজ অভিব্যক্তি বেশ ভালো। নাট্যে সঙ্গীতের ব্যবহার অসাধারণ, নির্দেশক সচেতনভাবেই বাংলা ও মুখ্যত হিন্দির চলচিত্রের বেশ কিছু জনপ্রিয় গানের ব্যবহার করেছেন। এই প্রয়োগ নাট্যটিকে একইসময় মজাদার ও দমদার করেছে। মঞ্চসজ্জার ক্ষেত্রে মঞ্চ পরিকল্পক নাটকের রূপকধর্মীতাকে মাথায় রেখে দৃশ্যসজ্জা করলে ভালো হতো। সমর পাড়ুই-এর আলোক-ভাবনা, সৌমি হালদারের পোষাক-ভাবনা নাট্যটির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। প্রাঞ্জল বঙ্গীকরণ গল্পের বহমানতাকে বজায় রাখে। এই নাট্যগোষ্ঠী বিষয় নির্বাচনে ও পরিবেশনে আগামী দিনেও একইরকম সচেতন থাকবেন এটা আশা রাখি। সবমিলিয়ে সাম্প্রতিক Aবং পজিটিভের ‘হালুম’ একটি মনোগ্রাহী প্রযোজনা।

সুমন্ত রায়