স্মৃতি থেকে সত্তায়: জীবনের মানে

ফিরে দেখা – লাইক কমেন্ট শেয়ার

সময়ের সঙ্গে তাল মেলানোর খেলায় সমতা রাখার উপায় হিসেবে জীবন যখন বন্দী হচ্ছে যন্ত্রের মধ্যে, যান্ত্রিকতাকেই আধুনিক যাপনের সমার্থক ভেবে নিয়ে সম্পর্ক, বেঁচে থাকা প্রভৃতি যখন সমর্পিত হচ্ছে মোবাইল অ্যাপসের কাছে, সোশ্যাল নেটওয়ার্কে ব্যস্ত থাকতে থাকতে যখন মানুষ হয়ে হয়ে উঠছে আনসোশ্যাল – তখনই যুগের সেই প্রথাগত যাপন আর মানসিকতার বিরুদ্ধে মঞ্চে জীবনের সুর শোনাছে “লাইক কমেন্ট শেয়ার”। ‘ঐহিক’ নাট্যগোষ্ঠী প্রযোজিত, স্বাতী রায় রচিত ও নির্দেশিত এ নাটক এই সময়ে হারিয়ে যাওয়া মানবিকতাকে এক লহমায় যেন জাগিয়ে দিচ্ছে দর্শকদের মধ্যে। কোনো তত্ত্ব বা ভারি বক্তব্য নয়, নিচ্ছক গল্প-আড্ডার মধ্যে দিয়ে স্মৃতিকে উস্কে জীবনের আর বেঁচে থাকার মর্মার্থ সহজে বুঝিয়ে দেওয়াই মূলত এই নাটকের মৌলিকতা, অভিনবত্ব।

জমে ওঠে আড্ডা, হুল্লোড়, গান। কখনো বা পরস্পরের মধ্যে খুনসুটি, অভিযোগ- অনুযোগ আর পড়ে থাকে আলো-অন্ধকারে মেশা ধুলোমাখা স্মৃতি

নাটকের ঘটনায় আসা যাক। এই নাটকে দৃশ্য থেকে বহু দৃশ্যান্তরে গিয়ে গল্প বা ভাবের বিন্যাস নেই, বরং শুরুতেই দেখা যায়, মঞ্চের পর্দা খোলা আর মঞ্চ জুড়ে রয়েছে এক সুসজ্জিত ড্রইং রুম। ফলে, দর্শক নাট্য ঘটনা দেখতে না যেন অথিতি হয়ে আসেন সেই ঘরে। ঘরে সোফা, সাজানো সেলর, ল্যাম্পশেড দেখতে দেখতেই দর্শক হয়ে পড়েন সে ঘরেরই অংশ। নিয়মমাফিক থার্ডবেল কানে এলে খানিক চমক ভাঙে, তবে তার পরই চরিত্রের প্রবেশ। দেবব্রত বিশ্বাসের গানের সুরে সুরে এগোতে থাকে নাটকের ঘটনা। পরিচারিকা টুম্পা মুছতে থাকে গেলাস-বাসন আর একরাস আনন্দ নিয়ে হাজির হন সেবন্তী। টুম্পা ও সেবন্তীর কথায় দর্শক বুঝতে পারেন সেবন্তী প্রবাসী। বছরে একবার কলকাতায় আসেন। সংসার ধর্ম পালন করে, জীবনের অনেকটা সময় পার করে তিনি এবার ফিরে পেতে চান সোনালী অতীতকে। তাই, দীর্ঘদিন পর ফেসবুক-ফোনে খুঁজে পাওয়া বন্ধুদের নিয়ে মেতে উঠতে চান রি-ইউনিয়নে। সেবন্তীর বাড়িতেই সেই রি-ইউনিয়নের আয়োজন। সন্ধের আলোয় ঘরে প্রবেশ করেন বাকি বন্ধুরা – অভি, ইন্দ্র, অনিন্দিতা ও সুনন্দ। পেশায় এরা কেউ এখন সরকারী কেরানি, কেউ ইঞ্জিনিয়র তো কেউ সমাজকর্মী। জমে ওঠে আড্ডা, হুল্লোড়, গান। কখনো বা পরস্পরের মধ্যে খুনসুটি, অভিযোগ- অনুযোগ আর পড়ে থাকে আলো-অন্ধকারে মেশা ধুলোমাখা স্মৃতি। সেই স্মৃতির সরণী বেয়েই প্রবেশ করে মন। মন অধ্যাপিকা। তবে, তার কলেজ জীবনের প্রেম দাম্পত্যে বদলালেও সে দাম্পত্য স্থায়ী হয় নি। তাই, প্রাক্তন প্রেমিক ও স্বামীর প্রসঙ্গে উদাস থাকতে চায়, বিষয়টাই এড়িয়ে যেতে চায় মন। ‘তবু মাঝে হল ছাড়াছাড়ি, গেলেম কে কোথায়’ সুর তুলে প্রবেশ করে পলাশ। বদলে যায় আড্ডা, বদলে যায় নাট্যকাহিনি। একে একে খুলতে থাকে চরিত্রের আড়াল, বদলে যায় গানের মানে।বন্ধুত্ব ও সময়কে বোঝাতে সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কাব্য পঙতি ‘কখনো কখনো মনে হয় যেন চিনি/ বিদ্যুতে লেখা হেন রূপরেখা/ চীনে পটে বন্দিনী’, কিংবা ভেঙে যাওয়া সম্পর্ক জুড়তে জয় গোস্বামীর ‘পথেরও আপত্তি কিছু নেই। গাছ?/ জানি, সেও রাজি হয়ে যাবে’ এর ব্যবহার নাটককে পৌঁছে দেয় অন্য মাত্রায়। আসলে, সংলাপের ঋজুতা নয়, মুহূর্তকে বাঁধার জন্য কবিতা ও গানের ব্যবহারই নাটকের ভাবনাকে আরও মেদুর ও মধুর করে তোলে। তাই, দর্শক তখন আর দর্শকের ভূমিকায় থাকেন না। কীভাবে যেন হয়ে ওঠেন সেবন্তীর ড্রইংরুমের আরেকজন বন্ধু। আর স্মৃতি সম্পর্কের মাঝে বিভোর হতে হতেই কলিংবেলের তীব্রতা ঘটিয়ে দেয় ছন্দোপতন। অনেকটা নীরবতা…. তারপর অন্য কাহিনি। এই সময় এ নাটক সংলাপধর্মী, আবার এ নাটক লিরিক্যালও। এই সময়ের, প্রজন্মের সমস্যার কথা বারবার উঠে এসেছে নাটকে, তবু কোথাও তা তত্ত্ব-তথ্যের ভারে ভারাক্রান্ত করেনি দর্শকদের। অস্ট্রেলিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণায় উঠে আসা ব্যক্তি বিচ্ছিন্নতার ‘phubbing’ থিয়োরির কথা যেমন অনায়াসে ব্যক্ত হয়েছে এ নাটকে, তেমনই তার পাশাপাশি ঘটি-বাঙাল, ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান, পয়লা বৈশাখ, সলিল চৌধুরীর আলোচনায় ভরে উঠেছে নস্টালজিয়া। সময়ের কোলাজ ও তার সঙ্গে ব্যক্তি মানসিকতার বুননই এ নাটকের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়।

যে নাটক শুরু হয় মঞ্চে, তার শেষ হয় মঞ্চ অতিক্রম করে প্রেক্ষাগৃহের বাইরে

তবে, যেহেতু নাটক, তাই অভিনয়ের কথা বলতেই হয়। আসলে, এ নাটকে বোধহয় তেমনভাবে কাউকেই মঞ্চে অভিনয় করার খুব একটা প্রয়োজন হয় না। জীবনের গল্প, স্মৃতির সংলাপ বলতে বলতেই অনায়সে বিভাস ঘোষ হয়ে ওঠেন অভি, শ্রীময়ী মজুমদার হয়ে ওঠেন সেবন্তী, দেবব্রত চক্রবর্তী হয়ে ওঠেন সুনন্দ কিংবা কাকলী ঘোষ হয়ে ওঠেন টুম্পা। তবুও, আলাদা করে বলতে হয় তিনজনের নাম। ইন্দ্র চরিত্রটি এ নাটকে ড্রামাটিক রিলিফ। অরিন্দম ঘোষ চরিত্রটিকে এত সহজভাবে উপস্থাপিত করেছেন, তার প্রশংসা করতেই হয়। মন চরিত্রে জয়ীতা চৌধুরী অনবদ্য। আর বোহেমিয়ান পলাশের দ্বিধা, দ্বন্দ্বকে অপূর্ব ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন অরিন্দম রায়। বাবিন চরিত্রে সৌভিকের অভিনয় তুলনামূলক ভাবে দুর্বল।

গান এ নাটকের আরেকটি সম্পদ। গানের নির্বাচন, ব্যবহার এই নাটকের গতি ও বক্তব্যকে আরও বেশি তীব্র করেছে। বিশেষ করে লোকগান ‘মনের আয়না মেলিয়া দেখলি’ নাটকের মূল বক্তব্যের ব্যঞ্জনা তুলে ধরেছে সার্থকভাবে। অরিন্দম রায়ের কন্ঠটিও মোহিত করে রাখে দর্শকদের। তবে, সব কিছুকে ছাপিয়ে যায় এ নাটকের নির্দেশনা। যে নাটক শুরু হয় মঞ্চে, তার শেষ হয় মঞ্চ অতিক্রম করে প্রেক্ষাগৃহের বাইরে। নস্টালজিয়ার মেদুরতা বদলে যায় জীবন ও মানসিকতার গভীর নীরবতায়। আর এই দৃশ্যান্তর ও ভাবনান্তর নির্মাণে নির্দেশক স্বাতী রায়ের মুন্সিয়ানা চূড়ান্ত প্রশংসার দাবি রাখে।

পিয়াল ভট্টাচার্য্য