পড়ে পাওয়া নাটক কি ষোলো আনা নাটকীয়?

ফিরে দেখা – পড়ে পাওয়া ষোলো আনা

নিটোল গল্পে বাঙালি জীবনের চেনা ছবিকে নাটকের ঘটনা দ্বন্দ্বে বুনে মঞ্চে বারবার নিয়ে এসেছিল গত শতকের  হাতিবাগান পাড়ার কমার্শিয়াল থিয়েটারগুলো। দর্শক মনোরঞ্জনের কথা মাথায় রেখেই এই নাটকের নির্মাণ হত, থাকতো সমাজ, পরিবার,ব্যক্তি নিয়ে বার্তা- তবে কখনোই প্রকটভাবে নয়। গল্পের চলনে, নাট্যঘটনার বাঁকে বাঁকে উঠে আসতো টুকরো সমাজ ভাবনার কথা। কিন্তু সে সব এখন ইতিহাস। তবে, সেই কমার্শিয়াল থিয়েটারের রেশ নিয়ে, দর্শকের মনোরঞ্জনকে প্রাধান্য দিয়ে ‘বেহালা ব্রাত্যজন’ নিয়ে এসেছে তাদের সাম্প্রতিক প্রযোজনা “পড়ে পাওয়া ষোলো আনা”। এই নাটকে হাসি আছে, কীর্তন আছে, আইটেম নম্বর আছে, আছে সাম্যবাদের কথা- খুব লঘু চালে কমেডির মোড়কে। আর এই কমিক রিলিফে, গল্পের ছলে সামাজিক বার্তা দেওয়াটাই এই নাটকের ইউ.এস.পি। নাটকের রচনা,নির্দেশনায় খরাজ মুখোপাধ্যায়, এমনকী অন্যতম প্রধান চরিত্রেও অভিনয় করেছেন তিনি। এই নাটকের সামগ্রিক পরিকল্পনায় রয়েছেন সুপ্রিয় চক্রবর্তী।

নাটকের গল্পটা একটু বলা যাক। গল্পের প্লট একটি গ্রাম-tআধা মফস্বলকে ঘিরে।সেখানকার বেশ ধণী, অধিকাংশ জমির অধিকর্তা, বাবু গোছের ব্যক্তি মদন (খরাজ মুখোপাধ্যায়)।তিনি একই সঙ্গে কৃপণ, এবং আরও অর্থের প্রত্যাশায় ভরসা রাখেন লটারির ওপর। বুবাই (ধীমান ভট্টাচার্য) এর বাঁধা খদ্দের সে।কিন্তু ভাগ্য তার এতই খারাপ, দীর্ঘদিন লটারির টিকিট কাটলেও একটা সামান্য পুরস্কারও তার জোটে নি। এদিকে সব হারানো ভানু (দীপ মহলানবিশ) ও তার ছোটভাই পানুকে (শান্তনু ঘোষ) একদিন আশ্রয় দিয়েছিলেন এই মদন। সেই ঋণ শোধ করার জন্য, চূড়ান্ত কৃতজ্ঞতায় ভানু বাবুর অনুগামী। আর তার ভাই পানু সুযোগসন্ধানী। বাবুর যাবতীয় দুষ্কর্মের অন্যতম সাগরেদ। একদিন বাজার থেকে ফেরার পথে বুবাই মদনকে লটারির টিকিট ধরায়, নারাজ মদন সিদ্ধান্ত নেয় আর লটারি সে কাটবে না। ফলে মদনকে বোঝাতে অপারগ বুবাই বাধ্য হয়ে তিনটে  টিকিট প্রায় গুঁজে দেয় পানুর পকেটে। ঘটনাক্রমে সেই তিনটে টিকিটের একটিতেই লাগে প্রথম পুরস্কার। পানু বোঝে, এবারই এসেছে সেই মোক্ষম সুযোগ। দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, শোষণ এর থেকে এসেছে মুক্তির উপায়। সে চায় দাদা আর তরুর (শ্রেয়া মুখার্জী) সংসার হোক, ঘুচে যাক অভাব অনটন। ফলে, সে লুকিয়ে রাখে লটারির টিকিটটা। আর তখনই বদলে যায় পরিচিত মুখগুলো। মদন, পঞ্চায়েত প্রধান (দেবাশিস সরকার), এমনকী পুলিশ ইন্সপেক্টর বাল গঙ্গাধর পন্ডিতও (রাজেশ শর্মা) রফায় আসতে চায় পানুর সঙ্গে। এতদিন দারিদ্রে বঞ্চিত পানু পায় সমাদর। শুধু একটা প্রথম পুরস্কার বিজয়ী লটারীর টিকিট, পানু ও কিছু মানুষের লোভ, আস্ফালন…. এই নিয়ে জমে ওঠে গল্প।

তিনি কখনো মাতাল, কখনো কৃষ্ণভক্ত, কখনো নারীসঙ্গ করা এক লম্পট আবার কখনো কৃপণ

এই নাটকে মনোরঞ্জনকেই প্রাধান্য দিতে চেয়েছেন নির্দেশক।ফলে এ নাটক ভীষণভাবেই অভিনয় নির্ভর। আর তার সিংহভাগ দায়িত্বটা নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন খরাজ মুখোপাধ্যায়। মদন চরিত্রের প্রত্যেকটা শেড তিনি বার করেছেন অপূর্বভাবে, নিছক হাসির আড়ালে। বিশেষ করে, একটি দৃশ্যে কৃপণ ভুবনের সামান্য পাঁচটাকার জন্য বারেবারে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া- এই নাটকে খরাজের অভিনয়ের অন্যতম সেরা মুহূর্ত। তিনি কখনো মাতাল, কখনো কৃষ্ণভক্ত, কখনো নারীসঙ্গ করা এক লম্পট আবার কখনো কৃপণ। আর এই প্রতিটা ক্ষেত্রে অভিনয়ের মাধ্যম হিসেবে তিনি বেছেছেন কমেডিকেই। পানু চরিত্রে শান্তনু ঘোষ অসাধারণ। স্যাটায়ারকে কীভাবে কমেডি নাটকে অভিনয়ের মধ্যে ব্যবহার করতে হয়, তা এখানে বারবার দেখিয়েছেন শান্তনু। বাল গঙ্গাধর পন্ডিত চরিত্রটি খুবই ছোট, বিশেষ অভিনয়ের জায়গাও নেই। তবু যতটুকু আছে সেখানে যথাযত অভিনয় রাজেশ শর্মার। ভানুর ভূমিকায় দীপ মহলানবিশ কিন্তু ততটা সুবিচার করতে পারেন নি চরিত্রটির প্রতি। তিনি যে ভানু চরিত্রে অভিনয় করছেন তা বোঝা গেছে, কিন্তু চরিত্র আর অভিনেতার একাত্মতার অভাবটা চোখে পড়েছে ভীষণভাবে। তরু চরিত্রে শ্রেয়া মুখার্জী ও সোহাগি চরিত্রে ঋষিতা মুখার্জীর অভিনয় এনাদের তুলনায় একটু পিছিয়ে। বিশেষ করে উচ্চারণ। গ্রামীণ ডায়লেক্টের জায়গায় মাঝে মাঝেই উঠে এসেছে বড় বেশি আরবান টোন। এই সামান্য ত্রু টিগুলো বাদ দিয়ে দেখলে দেখা যায় বর্তমান স্যোশিও ইকনমির ক্রাইসিসগুলো কমেডি ও এন্টারটেইনমেন্টে বেঁধে দর্শকদের কাছে কিন্তু অন্য নাটকীয় বার্তা আনে “পড়ে পাওয়া ষোলো আনা”।

নাটকে গান একটা বড় ভূমিকা নিয়েছে। সংগীত পরিচালনায় বিভু মুখোপাধ্যায়। খরাজ মুখোপাধ্যায় এর গান, সেইসঙ্গে প্রথম দৃশ্যে পুতুলনাচের আড়ালে টাইটেল কার্ড দেখানোর সিনেম্যাটিক কৌশল প্রথম থেকেই তৈরী করে এন্টারটেইনিং মুড। প্রতিভা মুখোপাধ্যায়ের পোষাক পরিকল্পনাও বেশ। বাঁশের ব্যবহারে গ্রামীণ মঞ্চসজ্জা নির্মাণে ডি’ময়ের মঞ্চভাবনাও প্রশংসনীয়। আলোক পরিকলনায় পৃথ্বীশ রাণাও তার নিজস্বতার স্বাক্ষর রেখেছেন।

পিয়াল ভট্টাচার্য